এই সংখ্যার লেখকসূচি - ফাল্গুনী মুখোপাধ্যায়, ঝর্ণা চট্টোপাধ্যায়, বিবি বসু, রুখসানা কাজল, ইন্দিরা দাশ, তাপসকিরণ রায়,আফরোজা অদিতি, হরপ্রসাদ রায়, সপ্তাশ্ব ভৌমিক, জ্যোৎস্না রহমান, ইন্দ্রনীল চক্রবর্তী ও ব্রততী সান্যাল ।

              সূচিপত্রে লেখকের নামে ক্লিক করে পড়ুন
আবার যদি

শুধু অবাক নয় চমকে উঠেছিল সুমনা । চমকে ওঠারই কথা । কলকাতার এই অল্পচেনা যায়গায় একজন ট্যাক্সিচালক তাকে, তার বাড়ির লোকেদের চেনে । সুমনা ভাবে কত আশ্চর্য ঘটনাই না ঘটে ! শিলিগুড়ি থেকে সুমনাকে মাঝে মাঝে কলকাতায় আসতে হয়না তা নয় । কিন্তু সে তো দু এক দিনের জন্য কাকার ফ্ল্যাটে ।  ঐ এপার্টমেন্টের দু একজন ছাড়া কে তাকে চিনবে এই ব্যস্ত আর ভীড়ে ঠাসা মহানগরে ! বছর তিনেক আগে চাকরীর পরীক্ষার সিট পড়েছিল । সেবারই শেষ এসেছিল । আর এবার আসতে হল এক আত্মীয়ের মেয়ের বিয়েতে । এবার দিদিকেও নিয়ে এসেছে । দিদি কোথাও যেতে চায় না ।  এবার স্কুলের গরমের ছুটি, সুমনার জেদাজেদিতে আসতে রাজি হয়েছে । কিন্তু বিয়েবাড়িতে কিছুতেই আসবে না, এই সর্তেই এসেছে ।

লেকটাউনে কাকার ফ্ল্যাটের কাছেই ট্যাক্সিটা পেয়ে গিয়েছিল সুমনা । লেকটাউন থেকে কুদঘাট আর কত দূর । তবু দিদি পইপই করে বলে দিয়েছিল বন্ধুদের সঙ্গে গল্পগুজব করে বেশি দেরি করবি না । চিন্তা হবে । সুমনা বলেছিল “তুমিও যেমন দিদি, কলকাতায় বন্ধু পাবো কোথায় ? তুমি ছাড়া আমার বন্ধুই বা আছে কে” ?

বলতে গেলে সুজাতাই সুমনাকে মানুষ করেছে । বাবা যখন মারা গেলেন সুমনা তখন আট বছরের, সবে ক্লাস টু পাশ করেছে । ট্যাক্সিতে উঠেই চালককে বললো ‘কুদঘাট যাবো’ । বিয়ের কার্ডটা সঙ্গে ছিল, বাড়িয়ে দিয়ে বললো ‘এই ঠিকানায়’ । এক ঝলক কার্ডটা দেখে ফেরৎ দিয়ে দিল ট্যাক্সির চালক । অভিভাবক হিসাবে নিমন্ত্রণ পত্রে ঠিকানা সহ দিদির নামটাই লেখা ছিল – সুজাতা সেনগুপ্ত, ১৭/১ স্টেশন রোড, শিলিগুড়ি ।

কাউকে জিজ্ঞাসা করতে হয়নি । ঠিক বাড়ির সামনে ট্যাক্সিটা থামলো । সুমনা নামলো । নেমেই প্রৌঢ় একজনকে প্রনাম করলো । ট্যাক্সিটা তখনও দাঁড়িয়ে । দুজনের কথা ভেসে আসছে । প্রৌঢ় জানতে চাইলেন, তুই একলা এলি, সুজাতাকে নিয়ে আসতে পারলি না । আরো কিছুক্ষণ দুজনে কথা বললো । বিয়েবাড়ির লোকজন আসা-যাওয়ার ভীড় ঠেলে ট্যাক্সিটা এগুতে চাইলো । তখনও দুজনে কথা বলছে । ধীরে চলমান ট্যাক্সিচালক প্রৌঢ়ের শেষ কথাটা শুনতে পেল ‘সেই সুজন নামের ছেলাটাও তো উধাও হয়ে গেলো’ ।

বেশি সময় নিল না। দিদির কথা মেনে এক ঘন্টার মধ্যেই রাস্তায় বেরিয়ে পড়লো, ফিরতে হবে এবার । একটা ট্যাক্সির আশায় রাস্তায় দাঁড়ালো । অপেক্ষা করতে হলনা মোটেই । একটা ট্যাক্সিটা এসে দাঁড়ালো সুমনার সামনে, চালক নেমে দরজাটা খুলে বললো ‘ওঠো’ । অবাক হল সুমনা । এ তো আগের ট্যাক্সিটাই, যেটা করে এসেছিল । হয়তো আবার তার মত কাউকে নিয়ে এসেছে । সুমনা ভাবলো । কিন্তু ‘ওঠো’ বললো কেন ? লোকটি সুমনার চেয়ে অনেক বড় বয়সে । তাহোক, কিন্তু একটা অচেনা মেয়েকে এক অচেনা ট্যাক্সি চালক তুমি সম্বোধন করবে ? রুষ্ট না হলেও অবাক হল সুমনা । অবাক হওয়া তখনও কিছু বাকি ছিল সুমনার । গাড়ি স্টার্ট করেই চালক বললো ‘দিদি আসে নি’ ?

এবার চমকে গেল সুমনা । শিলিগুড়ি থেকে এত দূরে কলকাতায় একজন ট্যাক্সি চালক তাকে চেনে, দিদিকে চেনে ! সুমনা ভাবতে চেষ্টা করলো, মানুষটা কে ? যে দিদিকে চেনে । দু গাল চাপা দাড়িতে মুখটা যতটুকু দেখেছে তাতে তো কিছু মনে করতে পারলো না । উত্তর না দিয়ে লোকটাকে বুঝতে চাইলো । চালক আবার কথা বললো ‘ কেমন আছে তোমার দিদি’ ? এবার উথাল-পাথাল সুমনার মনে । প্রায় সমবয়সী এক পুরুষ তার প্রায় পঞ্চাশছোঁয়া দিদি কেমন আছে জানতে চাইছে । কেউ তো ইদানিং এমন আন্তরিকায় জানতে চায়নি দিদি তার কেমন আছে । সুমনাই কি ভেতর থেকে কোনদিন জানতে চেয়েছে ?

ভালো করে জ্ঞান হবার পর দিদিকে কারো সঙ্গে মিশতে দেখেনি সুমনা । একজন স্কুল শিক্ষিকার যতটা গাম্ভীর্য কাম্য তার চেয়েও যেন বেশি গম্ভীর দিদি বাইরের জগতে । অথচ পনেরো বছরের ছোট সুমনার, দিদিই হল সবচেয়ে ভালো বন্ধু । সুমনা অতীতে চলে যায় । বাবা মারা যাবার পর দিদি কেমন যেন নিজেকে গুটিয়ে নিল বাবা যখন মারা গেল, সুমনা তখন সবে ক্লাস থ্রিতে উঠেছে আর দাদা সবে মাধ্যমিক পাশ করেছে । ক্রমে যেন একটা খোলসের মধ্যে ঢুকে গেলো দিদি । বাবা মারা যাবার দু বছর পর মা বিছানা নিলেন, দাদা বিয়ে করে আলাদা হয়ে গেল । দিদির এই নিজেকে গুটিয়ে নেবার পেছনে অন্য কোন কার্যকারণ আছে কি না, একটু বড় হয়ে জানতে চেষ্টা করেছিল সুমনা । খুব হালকা মনে আছে, সুজন দা বলে একজন আসতো বাড়িতে, মার সঙ্গে গল্প করতো, দিদিকে নিয়ে বেড়াতেও যেতো । তারপর হঠাৎ সুজনদার আসা যাওয়া বন্ধ হয়ে গেল । মানুষটাই যেন উধাও হয়ে গেল ।
সুমনা তিরিশে পা দিয়েছে । রেলের চাকরীটাও পেয়ে গেছে এক বছর হল । মা দিদির সঙ্গে পরামর্শ করে ওর বিয়ের জন্য । সুমনা জানে । দিদি তার বন্ধু, তাই একদিন সাহস করে জিজ্ঞাসা করেছিল “এমন করে নিজেকে গুটিয়ে নিয়ে কেন থাকিস দিদি ? সংসার করলি না, শুধু দিয়ে গেলি । কিছু পেতে চাইলি না ?”সুজনদাকে ফিরিয়ে দিয়েছিলি কেন দিদি ?

দিদি রাগ করেনি । মাথায় হাত বুলিয়ে বলেছিল সকলের কি সব কিছু পাওয়া হয় ? আমি পাইনি, তোর দাদা পেয়েছে, তুইও পাবি, এগুলোই তো আমার পাওয়া রে । দাদা বিয়ে করে অন্যত্র বাসা বেঁধেছে দিদির মত নিয়েই । দিদি বুঝেছিল, এখনকার আধুনিক মেয়ে বিয়ে না হওয়া বড় ননদের সঙ্গে মানিয়ে নিতে পারতো না । মাও তো তেমন করে জানতে চায়নি কোনদিন তার বড় মেয়ে কেমন আছে । মাকে মাঝে মাঝে শুধু বিড়বিড় করে বলতে শুনেছে “সুজাতা হাল না ধরলে সংসারটা যে কোথায় ভেসে যেত। তেমন ভাবে জানতে চেয়েছে কই তার বড় মেয়ে ভেতরে ভেতরে কতটা ক্ষয়ে গেছে ! আর তার অচেনা কলকাতার এক ট্যাক্সি চালক কেমন প্রশান্ত কন্ঠে জানতে চাইছে কেমন আছে সুজাতা ?

সুমনা বললো “আপনি আমাদের ভালোই চেনেন দেখছি, আগে শিলিগুড়িতে থাকতেন ? আপনার নাম কি ? সামনের মানুষটা উত্তর দিল অমন ভালো গান গাওয়া মার্জিত রুচির সুজাতা সেনগুপ্তকে শিলিগুড়ির কে না চিনতো ? আমি হয়তো একটু বেশিই চিনতাম । আমি যখন চিনতাম তখন তুমি ফ্রক পরা ছোট্ট মেয়েটি । সুমনা যেন অধৈর্য হয়ে উঠেছে । বললো “কিন্তু নামটা বলছেন না কেন ?”

ড্রাইভিং লাইসেন্সটা পকেটেই থাকে, পেছনের সিটে সুমনার দিকে বাড়িয়ে দিল । চমকে উঠে শিশুর মত চেঁচিয়ে উঠলো সুমনা । সুজনদা আপনি ! এখানে ! কোথায় থাকেন ? সুজনের মুখের কোন ভাবান্তর হয়েছে কি না বুঝতে চাইলো সুমনা। আয়নায় শুধু নির্লিপ্ত মুখটাই দেখলো । গাড়ি চালাতে চালাতেই কথা বলছে “থাকি, মানে এতো বড় আকাশ, একটা না একটা যায়গা জুটে যায়, আর একটা মাত্র পেট, চলে যায় ঠিক” । নিজের কথা বন্ধ করে জিজ্ঞাসা করলো ‘সুজাতা গানটা গাইছে তো ? নাকি সংসার করতে গিয়ে ওসব চুকে বুকে গেছে” । কোন কথাই বোধয়  কানে যাচ্ছিল না সুমনার । একটা ঘোরের মধ্যে থেকে ভাবলো সুজনদাও তবে দিদির মত নিজেকে শেষ করে দিচ্ছে ? সুমনা আর কিছু শুনতে পাচ্ছিল না, সে তখন চলে গেছে অনেক পেছনে ।

একটু একটু মনে পড়ছে সুমনার সেই এক্কা-দোক্কা খেলার বয়সের পুরোনো দিনের কথা । দিদি স্কুলে চাকরী পেল, শুনেছিল দিদির বিয়ে হবে সুজনদার সঙ্গে । তারপর কি যে হল ! বাবার মৃত্যু, মায়ের বিছানা নেওয়া, দিদির কাঁধে চাপলো সব দায় । সুজনদা শিলিগুড়ি থেকে কাউকে কিছু না জানিয়ে নিরুদ্দেশ হয়ে গেল । দিদিকেও কিছু জানায়নি । পরে মার কাছে শুনেছিল সুজনদা দিদিকে বলেছিল, “সব ঠিক হয়ে যাবে সুজাতা তুমি তোমার স্কুলের বেতনটা না হয় সংসারে দিয়ে দিও । দুটো বেশি গানের টিউশানি করে আমি ঠিক চালিয়ে নেবো । সুজাতাই পিছিয়ে গিয়েছিল । বলেছিল তা হয় না সুজন, ভাই-বোন দুটো ভেসে যাবে, তা হয় না । তুমি সংসার করো, সুখী হও, আমাকে ভুলে যাও । সুজনদা আর কিছু বলেনি, চলে এসেছিল । তারপর শিলিগুড়ি থেকেই নিরুদ্দেশ হয়ে গেল, কেউ সন্ধান দিতে পারেনি । মাঝখানে কুড়িটা বছর পেরিয়ে গেছে । সুমনার সন্বিত ফিরলো ফোনের তীব্র শব্দে । দিদি ফোন করেছে “তুই কোথায় এখন ? এতো দেরি হচ্ছে কেন ? এখনও ট্যাক্সি পাসনি নাকি ? বাইরে বেরোলে তোর আর বাড়ির খেয়াল থেকে না । দিদি চিন্তা করবে সে কথা আর মনে রাখিস না” । সুমনা জানিয়ে দিল “ফেরার পথে ট্যাক্সিতেই আছি দিদি , তুমি চিন্তা করো না। জানো দিদি আজ এক কান্ড হয়েছে । তোমাকে গিয়ে সব বলবো, তুমি খুব খুশি হবে” । ও প্রান্তে দিদির ধমক “পাকামি করিসনা, তাড়াতাড়ি ফের” । ফোনের স্পিকার অন করে রেখেছিল সুমনা । নিজের মনেই সুজন বলে চলেছে “সেই কন্ঠস্বর কত বছর পরে শুনলাম, সেই বকুনি, আমাকে যেমন বলতো, দেরি হয়ে যাচ্ছে সুজন, আমি না থাকলে ছোট বোনটা কিছুতেই পড়তে বসবে না” বলেই হো হো করে হাসলো ।


কতদূর এলো সুমনা বুঝতে পারছে না। জিজ্ঞাসা করলো “আমরা কি অন্য পথে যাচ্ছি সুজন দা ? দিদির ফোন করার মত দেরি তো হওয়ার কথা নয়” । সুজন জানালো “তুমি বুঝতে পারোনি, আজ ফুসফুসে একটু ময়দানের হাওয়া ভরলাম, রোজই তো অন্যের জন্য গাড়ি চালাই, আজ কিছুক্ষণ নিজের জন্য চালালাম । দেখো তোমার দিদি কিছু মনে করবে না” । কাকার এপার্টমেন্টের সামনে গাড়ি থামলো । নামতে নামতে সুমনা বললো “ একবার পাঁচ মিনিটের জন্য আসা যায় না সুজন দা” ? সুজনের ছোট্ট উত্তর এই জীর্ণ মানুষটার এখন আর সে সাহস নেই সুমনা”। বিষন্ন সুমনা দাঁড়িয়ে রইলো । 

গাড়িতে ওঠার আগে সুজন আর একবার দেখলো, ফ্ল্যাটের চার তলায় জানালা ধরে তখনও দাঁড়িয়ে রয়েছে এক নারীমূর্তি । 
ধারাবাহিক

এই প্রবাস (৪)

 
বাজারের দিকে আসতে গিয়ে দুলুর আবদারে ওরা তিনজন বব্বন সিং এর দোকানের দিকেই এগিয়ে এলো। বব্বন সিং এর চায়ের দোকান এ তল্লাটের সবচেয়ে বড় চায়ের দোকান। চায়ের দোকান দিয়ে যে কেউ এত বড়লোক হতে পারে, ধারণা করা যায় না। শহরে তার দুটো তিনতলা বাড়ি, একটা আম্বাসাডার গাড়ী, আরো একটা জীপগাড়ির মত বড় গাড়ি আছে যেটা শহরের বাচ্চাদের নার্সারি স্কুলে নিয়ে যাওয়া-আসার
  জন্য ভাড়া খাটে।  এছাড়াও গরু, মোষ সব মিলে অনেক কিছু। সকাল-বিকেল বোধ হয় শহরের অর্ধেক লোক এই দোকানে জমায়েত হয় চায়ের জন্য। আর শুধু কি চা! চায়ের সমস্তরকম সরঞ্জাম বিক্রি হয় এখানে। ছাঁকনি থেকে বড় ডেকচি মায় তোলা উনুন পর্য্যন্ত।

বিরাট একটা হলঘর। চারিদিকে অনেক  বেঞ্চ, চেয়ার-টেবিল পাতা আছে। দোকানে ঢুকতেই ডাইনে-বাঁয়ে দুটো বড় বড় উনুনে প্রকান্ড বড় দুটো লোহার কড়াই চাপানো। তাতে ইয়া বড় বড় লোহার হাতা ডুবোন  আছে। সব সময় দুধ ফুটছে। আর একটু এগিয়ে একটা উনুনে বিরাট বড় আরো একটা ডেকচি চাপানো,  হরবখত তাতে চা ফুটছে। এই দোকানের চা যে আর পাঁচটা দোকানের চায়ের চেয়ে আলাদা  স্বাদের, তা ওরা জানে। দুলু তো বলেই দিয়েছে—বব্বন শালা নির্ঘাত চায়ে হেরোইন মেশায়, নইলে এতো ভিড় হবে কেন? নির্ঘাৎ সবাই ঐ লোভেই এই চা খেতে আসে। দুলুর কথা শুনে ওরা সবাই হাসে,কিন্তু এটাও ঠিকএই  চায়ের লোভে ওরাও এই দোকানেই আসে।

তিনজনেই দোকানে গিয়ে দ্যাখে আজ ভিড় একদম নেই, দোকান একেবারে  শুনশান। কি ব্যাপার, কিছু হয়েছে নাকি! এতো ফাঁকা তো কোনদিন থাকে না, শহরে কিছু নাকি বব্বনের কিছু হল? দুধ জ্বাল দিচ্ছিল মোটা মত যে লোকটা, দুলু তাকে জিজ্ঞেস করল—কেয়া হুয়া ভাইসাব, কৈ আদমী দিখতা নহী, কুছ হুয়া, কেয়া?’
--হম কা জানে সাব, পুলিশ লোগ আনে সে সব ভাগ গয়ে...’
--পুলিশ! পুলিশ কিউঁ?
-- হম ন জানে সাব, সব কই
  কহ রহে থে  কি বব্বন কো উঠাকে লে গয়ে...বহোত মারা, বহোত পিটা...’
--তোকে বলেছি না, শালা নিশচয়ই হেরোইনের চক্কর...বাটু বলে ওঠে।
--তুই থাম, একটা এতো বড় দোকানের মালিক, রোজ দুবেলা সবাই আসছে, খাচ্ছে এখানে, আর আজকে তাকে পুলিশ নিয়ে গেল বলে কেউ তাকিয়েও দেখবে না, সবাই নিজের প্রাণ বাঁচাতে ভেগে যাবে! চল তো, চল দেখি সীতারামের দোকানে চল... কি লোক মাইরি সব!’ টুটুল বাটু আর দুলুর হাত ধরে টানতে টানতে দোকানের বাইরে বেরিয়ে এলো। মন থেকে মেনে নিতে পারছিল না টুটুল। এতো দিনের পরিচয়, বন্ধুত্ব, ভালবাসার কি তাহলে কোন দাম নেই? একটা লোককে এভাবে তোমরা সবাই ছেড়ে দিলে! সীতারামের দোকানের দিকে যেতে যেতে ওরা দেখল একটা পুলিশের গাড়ি বব্বনের দোকানের সামনে এসে দাঁড়াল।

 -পুলিশ ছুলে আঠারো ঘা জানিস তো, বব্বনের এখন অনেক ফ্যাকড়া যাবে’ বলল দুলু। সীতারামের দোকানের কাছে আসতে আসতে দেখল বাদল আর লাল্টু বসে আছে। দোকানের সীতারামের কাজ করে  দেয় যে ছেলেটা, মানকে, সে হাত-পা নেড়ে কিসব বোঝাছে ওদের। দুলু, বাটূ, টুটুলরা দোকানে এসে পড়ল।   



বব্বন সিংয়ের
  দোকানের গোলমালের খবরটা সীতেশ আগেই পেয়েছিল। অফিস থেকে ফিরে চা খেতে খেতে বাড়িতে কণার কাছে  শুনেছিল।
 --জানো,আজকে না ঐ বব্বন সিং...ওই যে গো, তোমাদের বড় চায়ের দোকানের মালিক, ওকে...পুলিশে ধরেছে’।
-কে বলল, তোমার গেজেট?’ বিদ্রূপ করল সীতেশ।
--হ্যাঁ, আমার গেজেট...’ হেসে ফেলে কণা। ‘ কিন্তু সত্যি ওকে পুলিশে ধরেছে, কি নাকি মেয়েদের নিয়ে...   কি একটা হয়েছে, কাকে যেন ঘরে রেখেছিল, সব বলাবলি করছিল...’ আবার বলে কণা। 
--যদি, নাকি,বোধহয়...এভাবে কথা বলো কেন, ঠিক করে বলতে পারো না?’ একটু যেন বিরক্ত হল সীতেশ। পুরোটা না জেনে কথা বলাই বা কেন!
--আমি কি ওখানে গেছি নাকি!’ অনুযোগের সুর কণার গলায়।
--দ্যাখোগে, কি শুনতে কি শুনে এসেছে, তোমার ইনফর্মার তো!’ এবার হেসে ফেলে সীতেশ।
-বেশ তো, নিয়ে এসো না কি খবর, এখন তো পাড়া বেড়াতেই যাবে!’
--পাড়া বেড়াতে যাবো, কত কাজ বাকি এখনও, আর কটা দিন পড়ে আছে পুজোর, সে খেয়াল আছে কারো? পাড়া বেড়ানোই বটে। সব সীতুদার মাথায় চাপিয়ে বসে আছে!’ কিছুটা ছদ্মরাগে বলে সীতেশ।  জানে সকলে তাকে ভালবেসেই এই কাজেই দায়িত্ব দিয়েছে।
 

চা-টা খেয়ে স্কুটারটা নিয়ে বাজারের দিকে বেরোল সীতেশ। কৌতূহল একটা ছিলই। তাছাড়া কাজও আছে। পুজোর মাত্র আর কটা দিন বাকি, লাল্টুদের আজ বলেছে সীতারামের দোকানে আসতে। চাঁদা কালেকশনের আজকেই শেষ দিন, বাকি টাকা ওদের নিয়ে এসে দোকানেই জমা দিতে বলা হয়েছে, কিছু কাজ এখনও বুঝিয়ে দিতে হবে। লাল্টুর ওপরই দায়িত্বটা দিয়েছিলো সীতেশ। দুলুরা এখনও ছোট, তাছাড়া
 ওদের দায়িত্ববোধটাও যেন ঠিকমত গড়ে ওঠেনি।  এখনকার এই বয়সের ছেলেরা এতো বেশী গুলতানিতে সময় নষ্ট করে! মনে মনে বিরক্ত বোধ করে সীতেশ, তাদের সময় ঠিক এইরকম ছিল না। পাড়ার বড়রা কিছু বললে ঠিক সময়ে ঠিক কাজটা করে দিত ওরা।  বাপি, তনু, শুভ, ঋষি এদেরও সীতেশ দেখেছে। বিনয়ী, পরিশ্রমী ছেলে ছিল সব। এরাও যে মুখের ওপর খুব একটা ওজর আপত্তি করে তা নয়, তবে ঐ যে কি যেন বলে মস্তি, সেটা এদের চাই, আর বড়দের সামনেও কোন কথা বলা আটকায় না। ইব্রাহিম, না টুটুল  বেশ মজা করে বলে কথাটা –ম স্‌ তি! এদের সব সময় মসতি চাই, মসতি! মনে মনে উচ্চারণ করে হেসে ফেলল সীতেশ। সীতারামের দোকানের কাছে এসে দেখল মানকে একনাগাড়ে হাত পা-মুখের বিচিত্র ভঙ্গিমা করে কি যেন বলে যাচ্ছে আর দুলুরা হাঁ করে শুনছে।  স্কুটারটা দোকানের সামনে এনে রাখল সীতেশ।

সীতারামের দোকানে এসে বব্বন সিংয়ের ঘটনায় যত না অবাক হল সীতেশ, তার চেয়েও সে অবাক হল মানকের বাচনভঙ্গীতে। মানকে, এই সেদিনের বাচ্চা, মা ভিক্ষে করে বেড়াত, মারা গেলে সীতারাম তার বাড়িতে আশ্রয় দিয়েছিল। পরে বড় হলে দোকানের কাজে লাগিয়ে দেয়, ওর বাড়িতেই থাকে কাজের লোকজনদের সঙ্গে। সেই মানকে, যার কিনা মেরে কেটে বছর দশেক বয়স হবে, সে হাত-পা নেড়ে বিচিত্র ভঙ্গীতে বর্ণনা করে যাচ্ছে বব্বন এর ঘটনা, তাও আবার যা কিনা নারীঘটিত! আর ছেলে গুলোকেও দেখো, হাঁ করে গিলছ ওর কথা। দোকানে পা দিয়েই মানকে কে এক ধমক লাগাল সীতেশ—এই, যা ভাগ, ভাগ বলছি! আর তোদের কাজ নেই, বসে বসে আড্ডা দিচ্ছিস...’ ছেলেদের বলে সীতেশ। দোকানে আসার পথেই কিছুটা শুনে এসেছে সীতেশ। বব্বনের সম্ভবতঃ অন্য কোন নারীর প্রতি আকর্ষণ, তার থেকেই সংসারে অশান্তি, মনকষাকষি। এরা পারেও বটে, সারাদিন ঐ হাড়ভাঙ্গা খাটুনি তার পরে আবার এইসব! বিচিত্র একটুকরো হাসি খেলে গেল সীতেশের মুখে। বাজারে এখন কতরকমের গুজব ছড়াবে এই নিয়ে। কিন্তু এরা কাজকর্ম ফেলে এইসব নিয়ে আলোচনা করুক মোটেও চায় না সীতেশ। কতকাজ বাকি...! সীতেশের ধমকানিতে বাদল, লাল্টুরা লজ্জ্বা পেল। কেউ উঠে দাঁড়াল, কেউ মুখ নিচু করল। লাল্টু এক থোক টাকা দিল সীতেশের হাতে, আজকেই শেষ চাঁদার টাকা। বাদল কয়েকটা টাকা মানকের হাতে দিয়ে বলল-যা, কেটলি নিয়ে যা, চা নিয়ে আয় সবার জন্য। দৌড়ে যা, অনেক কাজ এখন।‘

সীতেশ গম্ভীর মুখে কাগজপত্র নিয়ে বসল। দুলুরা একে অপরের মুখ চাওয়া-চাওয়ি করল তারপর সবাই মিলে সীতেশকে ঘিরে গোল হয়ে বসল।
আর কথা নয়, এবার পুজোর কথা, কাজের ফিরিস্তি। পুজোর আর চারদিন বাকি।

(ক্রমশঃ)



সখী ভালোবাসা কারে কয়....

ডাইনিং টেবিলের সামনে গিয়ে শাশ্বত হতবাক। মা বাড়ি নেই আজ তিনদিন। তাও ডিনারে ফুলকো লুচি,নারকোল কুচি দিয়ে ছোলার ডাল,বেগুন ভাজা,দই পটল,আমের চাটনি আর সিমাইয়ের পায়েস ! থালা সাজানোর ভঙ্গিটিও চমৎকার
মা,বাবা গেছেন কলকাতা থেকে খানিক দূরে এক অসুস্থ আত্মীয়ের চিকিৎসার সুবন্দোবস্ত করতে।ফিরতে ফিরতে আরো দিন সাতেক।বছর বত্রিশেকের শাশ্বত,তার একদা সহপাঠিনী স্ত্রী চন্দ্রিমার দিকে অবাক হয়ে তাকায় একবার।মুখে কিছু বলে না।
মুখোমুখি বসে দুই ভাই শাশ্বত আর অভিনব খুব তৃপ্তি করে আহার সারে।দুজনে যতবার লুচির ফরমাস করেছে,চন্দ্রিমা রান্নাঘর থেকে নিজে এসে গরম,গরম ফুলকো লুচি দিয়ে গেছে।
অভিনব চাপা গলায় জিজ্ঞেস করে,'কেসটা কি রে দাদা---ম্যাজিক?ফেয়ারি গডমাদার টাদারের কেস না কি? উমা মাসীর চোদ্দ পুরুষের অসাধ্য এমন রান্না করা---হল কি রে ?'
'থাম ছোটকু,খালি চ্যাংড়ামি।তবে আমিও তাজ্জব বড় কম নই বিলকুল ঘেঁটে ঘ'
এমন সময় দুই ভাইয়ের সামনে একটা সন্দেশের বাক্স নিয়ে এসে হাজির,তাদের প্রায় পনেরো বছরের পুরোনো রাতদিনের কাজের লোক---উমা মাসী
'ও বড়দা,ও ছোড়দা বউদিদি আপিস থেকে ফেরার সময় জলভরা আনিছে,লেবে আখন না কি কাল খাবা'?
উমাকে দেখেই অভিনব ধরে পড়ে,'এই মাসী তুমি এত ভাল রান্না করতে শিখলে কবে গো ? কুটনো কাটা আর বাটনা বাটা ছাড়া তো তোমাকে মা আর কিছু করতে দেয় না-----দেখে দেখে শিখে গেলে না কি ?'
'আ মরণ, কি কও বাপু তোমরা! আমি গেরামের গরিব ঘরের মেয়ে,আমি অত গরম মশলা,হিং এসব দে কি আন্না কত্তে পারি।আজ সব আন্না বউদিদি করেছে----এখনো ছ্যাঁক ছোঁক করে কি করতেছে, কাল টিপিন হবে।কি খাবার আমি বলতে পারবোনি----উশ্চারণ হয়নি'
'বল কি?' চোখ ছানাবড়া শাশ্বতর
রান্নাঘরের উদ্দেশ্যে চেঁচিয়ে জিজ্ঞেস করে,'চন্দ্রি, আজ অফিস যাওনি ? না কি  ম্যানেজ করে তাড়াতাড়ি কেটে এসেছো ?'
চন্দ্রিমা সামনে এসে দাঁড়ায়।স্মিত হেসে বলে,'এই সাড়ে তিনটের মধ্যে ফিরে এসেছি ম্যানেজ করে কোনমতে।'
'তা তো বুঝলাম কিন্তু এই ম্যাজিক দেখালে কি করে?আমরা তো জানি তুমি গৃহকর্ম-অনিপুণা। মা তো তোমাকে দিয়ে কিচ্ছুটি করান না।নিজেই খেটে মরেন'
অভিনব ফুট কাটে,'চাটনিটা কিন্তু মায়ের থেকেও ভাল হয়েছে রে দাদা----মা কালীর দিব্যি।'
শাশ্বত আবার বলে,'অদ্ভুত ব্যাপার পারো যদি করো না কেন ? আমার বুড়ি মা কে দুবেলা হেঁসেল ঠেলতে হয় আর মা থাকাকালীন যাও বা দু একবার রান্নাঘরে ঢুকেছো, যা বানিয়েছো, তা তো খাবার অযোগ্য। মুখে তোলা যায় না।আচ্ছা ছুপা রুস্তম তো তুমি '
স্বামীর ভ্রু যত ধনুকের মতন হয়, চন্দ্রিমার ঠোঁটে তত ত্রয়োদশীর চাঁদ খেলা করে
না, চন্দ্রিমা জবাব দেবার কোন প্রয়োজন বোধ করে না।
সেরাতের খাবার পাট চুকলে,দেবর আর স্বামী নিজের নিজের ঘরের দিকে হাঁটা লাগায়।চন্দ্রিমা পরের দিনের জলখাবারের প্রস্তুতি শেষে,এটা সেটা গুছিয়ে যখন খেতে বসবে,বসবে করছে----গ্যাস ওভেনের পাশে রাখা ফোনটা কর্কশ শব্দে বেজে ওঠে।
ফোন ধরতে দেখে,ফোনের ওপারে সায়ন্তনী----শাশ্বত আর চন্দ্রিমার কলেজবেলার বন্ধু।
ফোন ধরতেই সায়ন্তনী বলে,'ক্যায়া রে বস ? সমস্যা গম্ভীর হ্যায়।শালা শাশ্বত হারামজাদা আমাকে ফোন করে বলছে----তুই নাকি ওদের বুরবক বানিয়ে দুর্দান্ত রান্না করেছিস আজ।আমি বললাম,আরে চন্দ্রি তো স্কুলবেলা থেকেই দারুণ রান্না করে।বাড়ির ছাদে আমরা ফিস্ট করতাম----বরাবর চন্দ্রি মাংস আর চাটনিটা করতো।অবাক হবার কি আছে এতে?'
চন্দ্রিমা উত্তেজনা ধরে রাখতে না পেরে প্রশ্ন করে,'তোর কথার উত্তরে ও কি বলল রে ?'
'আরে বলছে,প্রায় দেড় বছর বিয়ে হয়ে গেল,তুই না কি দু তিনদিন মাত্র রান্না করেছিস।তাও যা বানিয়েছিস তা না কি অখাদ্য।ওর মা এত ভালো যে ওদের আড়ালে ডেকে বলেছেন তোকে দিয়ে ঘরের কাজ না করাতে।বলেছেন সকলে তো সব পারে না।উনি যতদিন বেঁচে আছেন,উনিই ছেলেদের রান্না বান্না করে খাওয়াবেন।আমি শুনে তো তাজ্জব!কেসখান কি খোলসা কর দিকিনি ন্যাকা সেজে থাকিস কেন?'
চন্দ্রিমা খানিক হেসে, আশপাশের দিকে না তাকিয়েই উত্তর দেয়,'কিছু না,স্রেফ টিঁকে থাকার স্ট্র্যাটেজি গুরু।শোন আমি বিয়ের আগে তো আর এই বাড়ি আসিনি।শাশ্বতর মাকে দেখিওনি এসে দেখলাম মহিলা রীতিমতন কুৎসিত----দাঁত উঁচু,মধ্য পঞ্চাশেই গাল ভাঙা, গ্রাম্য আর চূড়ান্ত অশিক্ষিত।ক্লাস ফাইভ অবধি পড়েছেন কি না সন্দেহ।সেটা কথা নয়।মহিলা মননেও অশিক্ষিতা।আর বেচারি অসম এক বিবাহে আবদ্ধ।শাশ্বতর বাবার ডেজিগনেশন আর ডেজিগনেশন জনিত ক্ষমতার বহর তো তুই জানিস সায়ন '
'হুম----ঠিক খোলসা হচ্ছে না ----এ প্রসংগে  ওগুলোর রেলেভেন্স কি?'
'রাই ধ্যৈর্যং । আমি দেখলাম----আমার মতন অর্থনৈতিকভাবে স্বাধীন, তথাকথিত শিক্ষিত আর একটু প্রেজেন্টেবেল বউ বাড়িতে আসার ফলে,মহিলা প্রচন্ড বিপন্ন বোধ করছেন দ্যাখ ওনার দোষ নেই----ওনার মনের আগল তো কেউ খুলে দেয়নি প্রত্যন্ত গ্রামের মেয়ে।গরু, জমি,লাঙল নিয়ে কথাবার্তা শুনে শুনে বড় হওয়া।ওনার বাপের বাড়িতে কতজন বাইরের লোক সকালে,বিকেলে দুধ,মুড়ি খায়---সেটা ওনার গল্পের আর গর্বের বিষয় উনি অ্যাকসেপটেন্স শিখবেন কি করে ? আধারই তো তৈরী হয়নি '
'উফ,ওরে জ্ঞানদানন্দিনী,খোলসা কর----রান্নার সাথে এসব মনন,চিন্তন,মনের অর্গল মার্কা বাতেলাবাজির সম্পর্কটা কি ? রাত দুপুরে বাতল দিচ্ছিস কেন রে ?'
'আসছি।বলতে দিবি তো ইন্টারাপ্ট করলে আর বলবো না বলছি '
'না বলো গুরু,বলো।শালা এম.সি.এ না করে সাইকোলজি পড়লে বোধহয় ভালো করতি---"
'দূর বলবো না।দূর হ,হতভাগা '
'বলেই ফ্যাল মা । মুন্নাভাইয়ের মতন টেনশন দেনে কা আদত ছোড় ইয়ার '
'দ্যাখ বিয়ের পর পর একদিন উনি ছিলেন না, একজন গেস্ট আসায় আমি চা করে দিই উনি ফিরে এসে রান্নাঘরে ঢুকেই আমাকে বললেন----দুধের মধ্যে একগাদা চা পাতা পড়ে আছে।উমাকে বকছিলাম।উমা বলল বউদিদি চা করে দে ছে '
'তো ?'
'তো আর কি ? আমি মুহূর্তে স্ট্র্যাটেজি ঠিক করে ফেললাম আমি আদৌ ওই দুধ দিয়ে চা করিনি ফ্রিজ থেকে মিল্কমেড বার করে চা করে দিয়েছিলাম।উনি এনি হাউ মিথ্যে কথা বলে কোথাও একটা জিততে চাইছেন আমি দেখলাম এই ব্যাপারটা নিয়ে ওনার সাথে লড়তে যাওয়া মানে নিজের শিক্ষাদীক্ষাকে অসম্মান করা। স্বল্প বুদ্ধি মহিলা যখন আমাকে প্রতিপক্ষ ভাবছেন,তখন আমাকে হেরে গিয়ে ওনার ইগো বুস্ট আপ করতে হবে।ওনাকে জিততে দিতে হবে।বোঝাতে হবে সংসারের পিভোটাল ফিগার উনি।উনি ছাড়া সংসার অন্ধকার গোমুখ্যু মহিলা----আমার এত ছক বুঝবেন না। মনে মনে ব্যাপক খুশি হবেন আর আমার আড়ালে দীর্ঘশ্বাস ফেলে ছেলেকে বলবেন----আমি মরে গেলে যে তোর কি হবে কে জানে! একথা বলে মনে মনে অত্যন্ত শ্লাঘা অনুভব করবেন।বেচারিকে ঈশ্বর রূপ,গুণ,বুদ্ধি সবেতে বঞ্চিত করেছেন।মরাল গাইডেন্সও পান নি।এই জেতাটুকু জিততে দিলে ওনার সদা সন্ত্রস্ত আত্মবিশ্বাস আর চুরচুর হবে না।তাই উনি আমাকে রান্না করতে বললে আমি ইচ্ছে করে আদা বাটা দিই না নয় ঘি দিতে ভুলি নয় বেশি হলুদ দিই।আমি চাই আমার অক্ষমতাটা উনি রেলিশ করুন।নয়তো অবসাদের শিকার হবেন মহিলা।না হয় আমার সংসার করা হলোই না----আমার তো একটা নিজস্ব জগত আছে।ওনার যে কিছুই নেই!'
'গুরুদেব তুমি মা জননী----পায়ের ধুলো দাও।তবে চন্দ্রি ধন্দে ফেললি।তোর স্ট্র্যাটেজি চাতুরি না উদারতা না কি অ্যাটেম্পট টু নারিশ ইয়োর ওন ইগো ঠিক বুঝতে পারছি না।হোয়াটেভার,শাশ্বত কিন্তু এখন আর ক্লাসমেট নয়----টিপিক্যাল ইন্ডিয়ান হাসব্যান্ড।তাকে আবার খোলসা করে সব বলতে যাসনি। ভারতীয় পুরুষ তার মায়ের কোন দোষ বা মীননেস আছে সেটা মানতেই পারে না।তাই ওসব মনন,চিন্তন,অশিক্ষা,সদা সন্ত্রস্ত আত্মবিশ্বাস কথাগুলো যেন ভুলেও শাশ্বতর কানে না যায়। কথাগুলো ফেলতেও পারবে না আবার গিলতেও পারবে না।একে ঘাঁটা মাল,আরো ঘেঁটে যাবে।একদিন বাড়ি আয় না রে----চুটিয়ে আড্ডা হবে।আজ রাখি।'
ফোন রেখে,খাওয়া দাওয়া সেরে ঘরে এসে চন্দ্রিমা দেখে নাইট ল্যাম্প জ্বলছে----শাশ্বত ঘুমিয়ে গেছে।
বালিশে মাথা দিতেই রাজ্যের ঘুম এসে চোখ জড়িয়ে ধরে চন্দ্রিমা নিশ্চিন্তে ঘুমোতে থাকে শাশ্বত ঘুমের ভান ছেড়ে উঠে বসে।নাইট ল্যাম্পের মায়া আলোয় বউকে দেখে আপাদমস্তক অভ্যাস মতন ছুঁতে গিয়ে হাত সরিয়ে নেয়।
চন্দ্রি তো জানে না সে ডাইনিং টেবিলে লাইটার ফেলে এসেছিল বলে,দিনের শেষ সিগারেটটা ধরাবার জন্য আবার ডাইনিং হলে ফিরে গিয়েছিল চন্দ্রি তখন টেলিফোনে বিভোর ইভসড্রপিং যদিওবা অসভ্যতা কিন্তু পা আটকে গিয়েছিল
যা শুনলো তাতে চন্দ্রির প্রতি সমীহ বাড়ল নি:সন্দেহে কিন্তু একটা প্রবল অসোয়াস্তি তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে শাশ্বতকে
বুদ্ধিমতীকে শ্রদ্ধা করা যায়, সমীহ করা যায় কিন্তু ভালোবাসা যায়  কি ?


রূপান্তর

বিরক্ত হয়ে জোহান ধপ করে চেয়ারটায় বসে পড়ল এবার। দারুণ উত্তেজনায় যতবার সে ফোন করে বাবাকে বলার চেষ্টা করছে চমৎকার খবরটা, তিনি ফোনই তুলছেন না। অথচ আজই সবে জানানো হয়েছে স্কুলে যে ড্রেসডেন শহরের ইন্টারস্কুল প্রতিযোগিতায় স্কুলের মুখপাত্র হিসেবে মনোনীত হয়েছেজোহান ক্রাউস, নির্বাচিত হয়েছে প্রধান গীটারিস্ট হিসেবে।

পুর্ব-জার্মানীর ড্রেসডেন শহরের অধিবাসী জোহানরা। জোহান গীটার বাজায় সেই নবছর বয়েস থেকে। অ্যান্টন-মামুই তো প্রথমগীটার বাজিয়ে শুনিয়েছিল জোহানকে। শহরের এল্বে নদীর তীরে নরম রোদে মাখামাখি পান্না-সবুজ ঘাসে চড়ুইভাতি করতে গিয়ে,সেদিন সেই ছোট জোহান সারাটা সকাল-দুপুর বাকি বাচ্চাদের সাথে হুল্লোড় করে খেলতেই পারল না। তার দুচোখ শুধু গীটারের ছয়খানা তারের ওপর ফ্রেট ধরে ধরে মামুর আঙ্গুলগুলোর অনায়াস চলাফেরা করাকেঅনুসরণ করে গেল! সেই প্রথমবার দেখা অ্যান্টন-মামার সঙ্গে। ঢাকনায় মোড়া স্প্যানিশ গীটারটা মামু নিয়ে এসেছিল সঙ্গে করে। মামা বোধ হয় মায়ের দূর সম্পর্কের ভাই, চাকরি করেন লিপজিগে। তার নিজস্ব সংসার, বউ-ছেলেমেয়ের কথা শোনেনি জোহান। মাই যেন তার একমাত্র আত্মীয়া ছিলেন। কিন্তু প্রথম দেখাতেই জোহানের চোখে নায়ক হয়ে উঠেছিলেন মামু, তার গীটারটায় শুধু হাত দিতে দিলেন তাই না, গীটারের সম্বন্ধে অনেক গল্প বললেন তাকে, জোহান গোগ্রাসে গিলতে থাকল তার প্রতিটি কথা।

দিনগুলো কাটত চমৎকার। মহানন্দে জোহানও মামাকে দেখিয়ে নিয়ে বেড়াত ড্রেসডেন শহর। মা কাণ্ড দেখে মুচকি মুচকি হাসতেন। মার্থা নিজেও তোখুব মিষ্টি সুরে গান গাইতে পারতেন,নাচও শিখেছিলেন ছোটবেলায়। তাই বাজনায় জোহানের আগ্রহ দেখে অখুশি হতেন না। অথচ বাবার দিক থেকে গানবাজনার প্রতি কোনরকম উৎসাহ কোনদিন ছিলনা। স্কুলের মাইনে, বইপত্তর, জামাকাপড়, সব কিছুরই ব্যাবস্থা সময়মত করে রাখতেন তিনি। এমনকি জন্মদিনে মাছধরার বড়শিটাও তো বাবাই কিনে এনে দিয়েছিলেন। কিন্তু ডমিনিকের খুব ইচ্ছে ছিল ছেলে তার মত লোহালক্করের অফিসে কেরানীগিরি না করে, পড়াশোনা করে বিজ্ঞানী অথবা ইঞ্জিনীয়ার গোছের কিছু একটা হোক। তাই জোহানের গীটার কেনার বায়নাটা নিয়ে জোহানের মায়ের সাথে একটু তর্কাতর্কিও হয়েছিল তাঁর। জোহান কিন্তু ততদিনে অ্যান্টন-মামুর একমাস ছুটির পরিধির মধ্যেক্রোম্যাটিকস আর কিছু সোজা কর্ডস শিখে নিয়েছে। সময় শেষ হলে মামু যেই তার গীটার নিয়ে ফিরে গেল, একখানা গীটারের জন্য খনই বাপের কাছে বায়না ধরল জোহান।

ইস্কুলের মিউজিক-রুমে গিয়ে পুরনো গীটার ঝেড়েঝুড়ে বাজানোর চেষ্টা করে জোহান। কিন্তু বাজনাগুলোর তারে মরচে পড়ে রয়েছে, ফ্রেটবোর্ড পুরনো, বারবার সুর করার চেষ্টাও বিশেষ সফল হয়না। আনন্দ পায়না ছেলেটা। অবশেষে স্ত্রী-পুত্রের কাকুতি-মিনতি, মান-অভিমানের কাছে হার মেনে গীটারটা কিনে দিলেন ডমিনিক, তবে শর্ত রাখলেন যেন পড়াশোনায় কোন রকম গাফিলতি ধরা না পড়ে। এরপরও অ্যান্টন-মামু বারকয়েক এসেছেন, ভাগ্নের অধ্যবসায় দেখে উপহার এনে দিয়েছেন ভাল টিউনার, কিছু ভালো অনুশীলনের বই।

মা-মার্থা যেমন সুন্দর গান গাইতেন তেমনই সুন্দর ছিলেন দেখতে। পার্টিতে যাওয়ার আগে বাদামী চুলের বড়সড় খোঁপাখানার ঠিক নীচে মার ফর্সা ঘাড়ের পেছনে যত্ন করে কেমন মুক্তোর মালাখানা আটকে দিতেন বাবা । শহরে কান্ট্রি-ফেস্টিভ্যালে মাজুর্‌কা, ফক্স-ট্রট যাই হোক না কেন, সবরকম নাচে সবার মধ্যে আলাদা রকম সুন্দর লাগত মা'কে। জোহান হাঁ করে দেখত তার অপূর্ব নৃত্যরতা মার মার সরু কোমর ঘিরে বিরাট ঘের-ওয়ালা সাদা লেসের পোশাক ঘুরত পাকে পাকে।

সে সময়ে ইস্কুলের পর বাড়ি ফিরে পড়াশোনা সেরেই সে বসে যেত বাজনানিয়ে। মা মাঝে মাঝে রান্নাঘর থেকে পায়ে পায়ে তার ঘরের দরজায় এসে চুপটি করে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে শুনতেন। কি যে ভাললাগত তখন জোহানের। সে ভাব দেখাত যেন সে জানতেই পারেনি মা যে এসে শুনছেন তার বাজনা। কিন্তু যেটুকু উৎসাহ সে পেত তাও বন্ধ হয়ে গেল। একবছর শীতে কঠিন নিউমোনিয়ায় শয্যাশায়ী হলেন মার্থা। সাতদিনের জ্বরে মারা গেলেন তিনি। জোহান তখন সবে হাইস্কুলের পরীক্ষা দিয়েছে। পড়াশোনাতেও সে পরিশ্রমী, তাই ফাইনালে সে ভালো ফল করবে, সে তা জানে। অথচ রেজাল্ট বেরনোর দিন ফলাফলের কাগজটা নিয়ে খুশিতে লাফাতে লাফাতে বাড়ি পৌঁছে কোনও লাভ হোলনা। আনন্দে মা যে বিছানায় উঠে বসবে সে ব্যাপারে নিশ্চিত ছিল জোহান। কিন্তু মায়ের ঘরের দরজার কাছে পৌঁছতে সে দেখতে পেল নার্স-আন্টি চোখে রুমাল চেপে বেরিয়ে গেলেন। বিছানার পাশে দুহাতের মধ্যে মুখ লুকিয়ে বড়সড় চেহারার ডমিনিক ফুঁপিয়ে কাঁদছিলেন। এই প্রথম জোহান বাবাকে দেখল এতটা ভেঙ্গে পড়তে। মায়ের অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া মিটে গেল। অ্যান্টন-মামা দিন দুয়েকের জন্য এসেছিলেন, ফিরেও গেলেন। কিন্তু ডমিনিক নীরব হয়ে গেলেন। অন্তর্মুখী মানুষ, কথাবার্তা তিনি বরাবরই কম বলতেন।

জোহান এখন সতেরো বছরের টগবগে জোয়ান। চমৎকার বাজনা বাজায় সে। স্কুলের গীটার টীমে সবার হিরো। ইস্কুলের মিউজিক টিচাররা অনেকেই অনুরোধ করেছেন ডমিনিককে, ছেলেটাকে বার্লিনে ইন্টারন্যাশনাল গীটার অ্যাকাডেমীতে পাঠানো উচিত। অ্যান্টন-মামুর সাথে যোগাযোগ করে বার্লিন যাওয়ার সম্বন্ধে জানতে চাওয়ার জন্য বাবাকেবেশ কয়েকবার বলল জোহান। কিন্তু ডমিনিকের সময়ই নেই। এদিকে মা মারা যাওয়ার পর মামুও যেন  দূরের মানুষ হয়ে গিয়েছে। জোহানের ফোন, চিঠি, কিছুরই জবাব দেন না আর।

মেধাবী জোহান শহরের ইন্টারস্কুল প্রতিযোগিতায় জোহান মনোনীত হোল, সে খুব চাইছিল প্রতিযোগিতার দিনটিতে বাকি সমস্ত ছেলেমেয়েদের মত তারও কোনও এক নিকটাত্মীয় প্রেক্ষাগৃহে বসে খুব জোরে জোরে হাততালি দিক, শুধু তারই জন্য। কিন্তু সে এই প্রতিযোগিতার খবরটা দেবে কি করে! ফোনটাই তার বাবা তুলল না। অভিমানে ফেটে পড়ল জোহান। চলেই যাবে সে, যেমন করেই হোক, বার্লিন শহরের সেই বিশাল অ্যাকাডেমিতে, তার জীবনের স্বপ্নকে সার্থক করতে।

প্রতিযোগিতার ফলাফল আশানুরূপ ভালো হোল, কিছু সান্মানিক জুটল জোহানের। কিন্তু এ আনন্দের সময় কার সাথে উদযাপন করবে সে! বন্ধুদের সাথে সন্ধ্যে অবধি হৈ-চৈ করে বাড়ি ফিরে সেই একই দৃশ্য, বাবা একহাতে খবরের কাগজ, অন্য হাতে কফির কাপনিয়ে, নিজের কাজের বিষয়ের নানা ফাইল-পত্র নিয়ে বসে আছেন নিজস্ব চিন্তায় মগ্ন হয়ে। সমস্ত ঘটনা বলার পর উঠে দাঁড়িয়ে জোহানকে এক মুহুর্তের জন্য বুকের কাছে টেনে নিয়েই তারপর নিজের ঘরে চলে গেলেন ডমিনিক।

এত শৈত্য, এতটা দুরত্ব জোহানের সহ্য হলনা। সে চেষ্টাচরিত্র করে, ইস্কুলের মিউজিক শিক্ষকদের সাহায্য নিয়েবার্লিন আন্তর্জাতিক গীটার অ্যাকাডেমিতে ভর্তি হওয়ার ব্যাবস্থা করে ফেলল। তার পুরস্কারের টাকাটা কাজে লাগল। অবশ্য যাওয়ার আগে বাবা ডমিনিক আরও কিছু আর্থিক সাহায্য সাথে দিয়ে দিলেন। সে ব্যাপারে কার্পণ্য তিনি কখনোই করেন না, তা ঠিক। কিন্তু ছেলে যে উষ্ণতা তার থেকে চায়, তা পিতা ডমিনিকের ব্যাক্তিত্বের মধ্যে খুঁজে পাওয়া অসম্ভব।

বিদায়ের সময় হাতের মালপত্র সামলে বাবাকে আলগোছে একবার জড়িয়ে ধরল জোহান। বয়েসের ভারে, স্ত্রী-বিয়োগের পর ডমিনিক একটু কুঁজো হয়েছেন, লক্ষ করলেন উচ্চতায়ছেলে অনেকটা ছাড়িয়ে গিয়েছে তাকে। চাকরীতে অবসরের দিন শুরু হতে তার আর বেশী বাকি নেই তার। ততদিনে ছেলেটা নিজের পায়ে দাঁড়ালে হয়, বললেন, ‘ঈশ্বর তোর সঙ্গে থাকুন
অ্যাকাডেমিতে জোহানের সাথে যোগ দিয়েছে অনেক ছাত্রছাত্রী। হোস্টেলে পৌঁছতেহোস্টেল অধিপক্ষ জানালেন,একটি ঘর তার নামে বুকিং করা রয়েছে, এবং পুরো বছরের জন্যই তার খরচা জমা করা আছে।

মহাবিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীর ভিড়, স্নাতক ছাত্রছাত্রী,দেশবিদেশ থেকে আমন্ত্রিত মাননীয় শিক্ষকেরা, রুটিন, শিক্ষণপ্রণালী,   পরীক্ষার কারিক্রম সমস্ত জেনেশুনে জোহানের মনে হোল, এতদিনে সে গীটার শেখার পীঠস্থানে এসে পৌঁছতে পারল। পড়াশোনার জন্য বইপত্তর ল্যাপটপের ব্যাবস্থা করা হয়ে গেল। খুব মন দিয়ে পড়াশোনা, অনুশীলন করতে লাগল জোহান। দিনে দিনে তার ফলাফল দেখে তার শিক্ষকরাও খুশি।
বাড়ির সাথে সম্পর্ক ক্ষীণতর হয়ে আসে। কয়েকমাস পরে ডমিনিক জানালেন কর্মসূত্রে তার এবার অন্যান্য দেশে ট্যুরে যেতে হতে পারে, তাই যোগাযোগ হয়ত সাময়িকভাবে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবে।তবে জোহানের পড়াশোনার জন্য খরচার ব্যাবস্থা করা থাকবে। অথচ জোহানের স্বপ্নের অ্যাকাডেমি তার কেমন লাগছে সে ব্যাপারে ডমিনিক বিশেষ উৎসাহ  দেখালেন না। অবশ্য এমনটাই যেন প্রত্যাশিত ছিল।
সারাদিনের ক্লাস, সেমিনার,অনুশীলন জোহানকে ব্যাস্ত রাখত। সন্ধ্যের পর হোস্টেলের ঘরে ফিরে গিয়ে একটু একা লাগত তার। ল্যাপটপে ফেসবুক খুলে নানা পুরনো বন্ধুদের খুঁজে গল্পস্বল্প করার চেষ্টা করত সে। সেইসময়েই আলাপ হোল সাইমনের সঙ্গে।

সাইমন হ্যামবার্গে থাকে, চাকরীকরে। তার একটিমাত্র ফটো ফেসবুকে। লেকের পাশে দাঁড়ানো লম্বা-চওড়া মানুষটিকে দেখে মনে হয় বছর তিরিশ থেকে মাঝবয়েসী পর্যন্ত যে কোনও বয়েসরই হতে পারে সে।ফটোতে বিকেলের সুর্যের  আলো হেলে পড়েছে মাথার পেছনে, তাছাড়া উঁচু লম্বা সিডার, পাইন গাছগুলোর মাঝখানে সে দাঁড়িয়ে, মুখখানা খুব একটা পরিস্কার নয়। লাজুক সাইমনতার মুখবইতে নিজের আত্মীয়স্বজনদের সম্বন্ধে, বা নিজের সম্বন্ধে বেশী কিছু লিখত না। লোক হিসেবেওসে খুব একটা মজাদার নয়। তার মা-বাবা নেই। বিয়ে-থা হয়েছে বলে মনে হয়না, স্ত্রীর কথা কখনো সে বলেনি,হয়ত ডিভোর্সি। অভব্যতা হতে পারে ভেবে যেচে জোহান এই ব্যাপারে কিছু জিগ্যেস করেনা। চাকরি করে অবসর সময়ে বই-পত্রিকা এইসব পড়েইসাইমনদিন কাটায়। কিন্তু সে ভালো বন্ধু, বেশ মন দিয়ে জোহানের নতুন জীবনের অধ্যায়গুলোর খুঁটিনাটি সব বৃত্তান্ত শুনে চলে দিনের পর দিন। মহা উৎসাহে নতুন কর্ডসঅনুশীলনের কথা জোহান জানায় সাইমনকে চ্যাট-বাক্সে। সাইমন অতটা না বুঝলেও, দুই-তিন দিন পরপরই জানতে চায় আর কি নতুন শিখল জোহান। সখ্যতা বেড়ে ওঠে।

ড্রেসডেনের ইস্কুলের পুরনো বন্ধুদের সাথে কিছুদিন যোগাযোগ থাকলেও প্রাক্তন সহপাঠীরা বেশির ভাগই কেরানীগিরি, চাকরিবাকরি নিয়ে ব্যাস্ত। তারা কি বুঝবে পেন্টাটনিক্‌স্‌ প্র্যাকটিসের জন্য কত পরিশ্রমকরা প্রয়োজন, কেউ শুনতে চায়না গীটারের ফিঙ্গার স্টাইলিংএ তরতরিয়ে কেমন এগোচ্ছে জোহান।

তাই সাইমনের উৎসাহটুকুই জোহানের জন্য অনেকটা পাওয়া। নতুন শেখা মেলোডির কথা পুঙ্খানুপুঙ্খ ভাবে চ্যাটবক্সে লেখেসঙ্গীত-পাগল জোহান, পরিবর্তে খোঁজ নিতে ভুলে যায় বন্ধুর জীবনযাত্রার কথা। হঠাত কখনও জিগ্যেস করলে  সাইমন বলতে বসে- এ বছর হ্যামবার্গে শীত আসবে বোধ হয় দেরীতে, কিন্তু থাকবে অনেকদিন।হ্যামবার্গের নর্থ-সীর কাছাকাছি নিউওয়ের্ক আর সারহর্ন দুটি দ্বীপে বারদুয়েক সে বেড়াতে গিয়েছে, তবে নিগেহর্ন দ্বীপটিতে তার যাওয়া হয়নি। গল্পই শোনায়সে, জোহানকে কোনোদিন অবশ্য তার নিজের শহরে নেমন্তন্ন করেনা। তার বাড়িতে বেড়াতে যাওয়ার জন্য আগ্রহ প্রকাশ করার থেকে জোহান তাই বিরত থাকে।

অ্যাকাডেমিতে ভর্তি হওয়ার পর শুরু শুরুতে ড্রেসডেনে বারকয়েক ছুটির সময় গিয়েছে জোহান। শেষবারের কথা মনে পরে তার। মায়ের কবরে ফুল রেখে অনেকক্ষণ চুপ করে বসেছিল সে। বাবার সাথে দৈনন্দিন জীবনের সাদামাটা কথাবার্তা বলতে বলতেই দিনকয়েকের ছুটি শেষ হয়েছিল। পুরনো শহর, আর কিছু ছোটবেলার বন্ধুকে বিদায় জানিয়ে ফিরে এসেছিল জোহান।কেমন একটা দৃঢ় ভাবনা ভরে ফেলছিল তার মন, ধীরে ধীরে সংযোগ হারাচ্ছে সে পুরনো জীবনের সাথে - নিঃশব্দে, কিন্তু নিশ্চিতভাবে।
মনখারাপটা ঝেড়ে ফেলে দিয়েছিল সে, যখন এলমার আগমন হোল তার জীবনে। একদল নতুনদের সাথে পরের  বছর চশমা পরা, সোনালী চুল, রোগাটে মেয়েটি ভর্তি হোল। কোনওমতে মস্তবড় ব্যাগ, হাতের কাগজপত্রের ফাইল আর কাঁধের গীটারখানা সামলে ভীতু ভীতু মুখে এদিক ওদিক তাকিয়ে করিডোর পেরিয়ে চলেছে সে ক্লাসরুম আর গ্যালারী চিনতে। জোহান খোঁজ নিয়ে জানল এলমা এসেছে বার্লিনের দক্ষিণ-পুর্ব ছোট্ট দ্বীপ-শহর ওয়ার্ডার থেকে। জায়গাটি হাভেল নদীর ওপর অবস্থিত। মেয়েটির ওপর একটা সহানুভূতি তৈরি হোল জোহানের। তারই মত, অথবা তারও চেয়ে একটু অপেক্ষাকৃত অশ্রুত জায়গার মেয়ে এলমা। পায়ে পায়ে এগিয়ে গিয়েছিল জোহান আলাপ সারতে। গুটেন মর্গেনবলতেই মেয়েটা এমন চমকে গেল যে তার পিঠে ঝোলানো গীটারের গুঁতোয় জোহানের নাকখানা টমাটোর মত লাল হোল। বেশ কয়েকবার ক্ষমাপ্রার্থনা করল কন্যে। যখন কফির কাপ নিয়ে বসল ওরা, প্রথমেই ঝরঝর করে কেঁদে ফেলল নবাগতা। একদম হারিয়ে যাচ্ছে সে এত্তবড় শহরে, এই এতবড় প্রতিষ্ঠানে। পালিয়ে বাড়ি ফেরত যেতে ইচ্ছে হচ্ছে যে তার! আলাপ জমাতে অন্ততঃ নামটা জানা প্রয়োজন। নিজের নাম জানিয়ে, “উই হাইবেন সীদু-চারবার জিগ্যেস করেও জোহান সোনালী-চুলো ছিঁচকাঁদুনের নাম জানতে পারলনা। সে তখনও ধরা গলায় বলে যাচ্ছে তার শহর হাভেল-ওয়ার্ডার কত স্নিগ্ধ মনোরম, বলে চলেছে সেখানকার মাছধরা নৌকাদের কথা, বসন্তের আপেল গাছের মিষ্টি ফলের কথা ইত্যাদি। জোহান ততক্ষণে বুঝে গেছে, এ মেয়ে একদমই শহরের সপ্রতিভ মেয়েদের মতন নয়, বরং জোহানের চেয়েও চলতি ভাষায় যাকে বলে গেঁয়ো। অনেকক্ষণ একাই কথা বলে বোধহয় একটু সুস্থ বোধ করলো মেয়েটা। এবার ঠান্ডা হয়ে যাওয়া কফি এক নিঃশ্বাসে শেষ করেই বলে উঠল, “আচ্ছা আমার একটা নাম আছে, তুমি আমায় এলমা বলে ডাকছ না কেন বলত!?” মুচকি হেসে জোহান জবাব দিল, ‘তাইতো, একদম ভুলে গেছি

জোহানের ওপর দারুন ভরসা তৈরি হোল এলমার। পড়াশোনা, প্র্যাকটিস সম্বন্ধে আলোচনা ছাড়াও যখন সে জানতে পারল অ্যাকাডেমির বেশ কয়েকটি স্কলারশিপ পেয়েছে ছেলেটি, তখন শ্রদ্ধা মেশানো একটা ভালোলাগা তৈরি হওয়া তো অবশ্যম্ভাবী। কথায় কথায় এলমার বাবা-মা আর ছোট বোনের কথা জানল জোহান।জোহান জানালো তার উদাসীন বাবা, হারিয়ে যাওয়া প্রিয় মা, ফেলে আসা শহর ড্রেসডেনের কথা, ও প্রিয় বন্ধু সাইমনের কথা, সাইমন - যাকে সে এখন অবধি দেখেনি, দেখা হওয়ার সম্ভাবনাও কম, অথচ যার সাথে বন্ধুত্ব প্রগাঢ়।

স্নাতক জোহান অতিক্রম করেছে সাধারণ ও উচ্চতর ও উচ্চতমস্তরের পরীক্ষাগুলি। ফাইনালের পর কনসার্টে বাজানোর প্রশিক্ষণে সে ব্যাস্ত। তার প্রতিটি বছরের মানপত্র, পুরস্কারের ছবি সে সাইমনকে ইন্টারনেটে পাঠায়। প্রাণ খুলে অভিনন্দন জানায় বন্ধু, আশা দেয় একদিন জোহান হবে ক্রীস র্যানসের মতন বিখ্যাত গীটারবাদক, যিনি ছিলেন জোহানেরই মত পূর্ব-জার্মানির মানুষ, ড্রেসডেন হাই-স্কুল-অফ-মিউজিকে হাতেখড়ি নিয়েছিলেন, পরবর্তীকালে অ্যাকুস্টিক গীটারের জগতে দারুন বিখ্যাত হয়েছিলেন। জোহানের ভালো লাগে এই সহৃদয় অনুপ্রেরণা। ইদানীং সে সাইমনকে মেল করে এলমার ছবিও পাঠিয়েছে। সাইমনের তো স্কাইপের কানেকশন নেই।

এলমার সাথে সম্পর্কটা কোন দিকে যাচ্ছে সেটা জোহান ঠিক আঁচ না করতে পারলেও সাইমন নিশ্চিত, এলমাই হবে জোহানের যোগ্য জীবনসঙ্গিনী। পাশ করার পর উচ্চতর ট্রেনিং এর জন্য এলমা বেছে নিয়েছে ক্লাসিক্যাল গীটারের প্রশিক্ষণ। নাইলন তারের যন্ত্রে আঙ্গুল দিয়ে বাজিয়ে অদম্য আগ্রহে জোহানকে শোনায় সদ্য শেখা ফলসেটা,ফ্ল্যামেঙ্কো স্টাইলের বাজনার বিন্যাস। দুজনে ভেসে যায় সুরের মূর্ছনায়, এক সুন্দর পারস্পরিক ভালোলাগা আর মুগ্ধতায়ঘনিষ্ঠতা বাড়ে। জোহানের একাকিত্বের দিন বোধহয় শেষ হোল।

ড্রেসডেনে বাড়ি যাওয়া হয়নি অনেকদিন। বড়দিনও গতবছর বার্লিনেই কাটিয়েছে জোহান। এলমা নিজের বাড়ি গিয়েছিল, বাড়িতে বলেছে জোহানের কথা, আমন্ত্রণ জানিয়ে রেখেছেন ওর বাবা-মা জোহানকে। জোহানের বাবা খুব কমই যোগাযোগ করেন আজকাল। চাকরীর থেকে অবসর নেওয়ার পরও তিনি কিছু বেসরকারি সংস্থায় কাজকর্ম করছেন, অন্তত যতদিন না জোহান রোজগারপাতির উপযুক্ত হয়।
জোহানের প্রথম দুটি একক অনুষ্ঠান হয়ে গেছে।একবার সে বাবাকে কনসার্টের কার্ড পাঠাতে চেয়েছিল, কি ভেবে আর পাঠায়নি। কার্ড ইন্টারনেটে পাঠিয়েছে সে প্রিয় বন্ধু সাইমনকে। এলমার বাবা-মা এসেছিলেন, অভিনন্দন জানিয়ে গিয়েছেন। ইন্টারনেটে কার্ড কিনেছে অনেকেই। তার মধ্যে একজন ভক্ত অনুগামী কিনেছে কুড়িখানা কার্ড। সে পাগল আর কেউ নয়, সাইমন নিজে। চাকরীর ব্যাস্ততার জন্য সে নিজে আসতে পারবেনা, কিন্তু তার নানা বন্ধু-বান্ধবীকে সে ফাংশনে উপস্থিত থাকার জন্যকার্ড পাঠাবে। ভিড় হয়েছিল, সভাগৃহ দুদিনই ভর্তি। উচ্ছসিত প্রশংসা পেয়েছে জোহান শ্রোতা, খবরের কাগজ, টি-ভি চ্যানেলদের কাছে।

এবার জোহান এনগেজমেন্টটা সেরেই ফেলল এলমার সঙ্গে। ডমিনিক ব্যাস্ততার মধ্যে বেশ মোটা টাকার চেক পাঠিয়ে আশীর্বাদ জানালেন। বিয়ের অনুষ্ঠান হোল এলমাদের ছবির মতন সুন্দর ছোট্ট দ্বীপের কটেজে। তার বাবা-মা-বোন আত্মীয়স্বজন অনেক আনন্দ করলেন। নুন এবং রুটি নিয়ে এলমা এলো বিয়ের মন্ডপে, আর জোহানের হাতে তাজা শস্য। এ দেশে বিয়ের অনুষ্ঠানে এমনটাই প্রথা। আঙটি বদলের পর বর-বউ গ্লাসে চুমুক দিয়ে একসাথে শেষ করল শ্যাম্পেন, বিয়ারের মগ তুলে অভিনন্দন জানালেন আত্মীয়-বন্ধুরা, তারপর শুরু হোল জার্মান ওয়ল্‌ট্‌জ। অজান্তেই চোখ ভিজে উঠছিল জোহানের মার কথা ভেবে। তার রাজহংসীর মত সুন্দরী মা, তিনিও আজ কাছে নেই তাকে আর তার নতুন বধূকে আশীর্বাদ করতে। কিন্তু এলমার আঙ্গুলের বড় হীরের আংটিটাও অনেকখানি আত্মপ্রসাদ এনে দিলো তার মনে। ড্যাড ডমিনিক নিজে না আসতে পারলেও চমৎকার উপহারটির ব্যাবস্থা করে দিয়েছেন।

সবচেয়ে বেশী তাদের অবাক করল কিন্তু বন্ধু সাইমন। কাজে ব্যাস্ত থাকায় ভোজসভায় আসতে পারেনি সে ঠিকই। কিন্তু বিয়ের পরের পরদিনই রাইন নদীর ওপর রোম্যান্টিকনৌকাবিলাসের দুটি টিকিট এসে পৌঁছল নবদম্পতির নামে। হয়ত এই জন্যই সাইমন এলমার বাড়ির ঠিকানাটা অত করে জানতে চেয়েছিল। লোকটির ফোন-নম্বর ইন্টারনেট থেকে খুঁজে আগেও ফোন করেছে জোহান, কথা বলতে পারেনি। এবারও কৃতজ্ঞতা জানাতে দুই-তিন দিন ধরে বারবার চেষ্টা করে ধরে নিতে হোল হয়ত বা তার ফোন খারাপ। মধুচন্দ্রিমার বেড়াতে যাওয়ার দিন আগত প্রায়। ফেসবুকের মেসেজ-বাক্সেই ধন্যবাদ জানিয়ে দয়ালু বন্ধুর জন্য একটি সুন্দর চিঠি লিখে রাখল জোহান-এলমা ।

রাইন ক্রুইসের মনোরম যাত্রা দুটি রাত ও তিনটি দিন ধরে। অনেক ছবি বন্ধু সাইমনকে ই-মেল করে পাঠিয়েছে জোহান। এমন চমৎকার ভ্রমণ তো তারই দেওয়া আশাতীত উপহার।

বার্লিন ফেরার পর কাজে ডুবে গেল ওরা দুজনেই। কিছু মিউজিক অ্যালবাম জোহানের ততদিনে প্রকাশ হয়েছে। সঙ্গীতজগতে সুনাম অর্জন করছে সে। নানা জায়গার থেকে আমন্ত্রণ আসে তার কাছে বাজনা শোনাবার জন্য। তাছাড়া আকাডেমির শিক্ষক হিসেবে সে পড়ায়, শেখায়, আরও হাজার হাজার ছাত্রছাত্রীকে উজ্জীবিত করে।সহধর্মিণী এলমাও  চাকরি পেয়েছে।

কিন্তু কিছুদিন হোল সাইমনের কোন খবর নেই। ফেসবুকে, চ্যাটবাক্সে তার এইরকম অনুপস্থিতি তো আগে দেখেনি জোহান! হয়ত সে কাজের চাপে খুবই ব্যাস্ত হয়ে পড়েছে, মনকে প্রবোধ দেয় জোহান। কিন্তু ই-মেলে কুশল জিজ্ঞাসার  যখন জবাব পাওয়া গেলনা তখন চিন্তায় পড়ল সে। এ বন্ধুর সাথে যদিও দেখা হয়নি কোনদিন, তবুও যেন বহুদিনের পরিচিতির ভরসা-সৌহার্দ্যে ভরপুর হয়েছিল তাদের সম্পর্ক।জোহানের জন্য সে ছিল আপনজনের চেয়েও প্রিয়, একমাত্র অনুপ্রেরণা ও উৎসাহের উৎসস্থল।

রাগ, অভিমান, একটু দুশ্চিন্তা নিয়ে তাকে আবার একদিন ফোন করল জোহান, কিন্তু আবার বিফল হোল সে। সাইমন কি জেনেশুনেই তাকে এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছে? পুরনো বন্ধু যে এমন ব্যাবহার করতে পারে ভেবে খারাপ লাগল জোহানের। কই, সে নিজে তো সাফল্যের চূড়ায় পৌঁছেও বন্ধুকেভোলেনি। চেষ্টা করেও যোগাযোগ স্থাপন না করতে পেরে হাল ছাড়তে বাধ্য হোল জোহান। কাজকর্মের ব্যাস্ততা টেনে নিল তাকে যতদিন না পুরনো শহর ড্রেসডেন থেকে হঠাৎ পিতৃবিয়োগেরখবর এলো। বাবা বৃদ্ধ হলেও সুস্থ্ই ছিলেন, চলাফেরাকরতেন, অন্তত তাই তিনি জানিয়েছিলেন। হঠাৎই হৃদরোগে মারা গেছেন তিনি, পাশের বাড়ির পড়শী জানালেন। দেরী করেনি জোহান। এলমাকে নিয়ে ট্রেন ধরল তাড়াতাড়িই। এলমা অন্তঃসত্বা। অথচ তাদের ছোট্ট নবাগত বা নবাগতাকে বাবা দেখে যেতে পারলেন না, সফর করার সময় কষ্টে গলার কাছটা একটু ব্যাথা করে ওঠে জোহানের।

পুরনো বাড়িটা একই রকম রয়েছে। বাবার কিছু বন্ধু, সহকর্মী ও পাড়া-প্রতিবেশীর সাহায্যে শেষকৃত্য সেরে বাড়ি ফিরল জোহান। দু-চারদিন পার হয়ে গেল। এক বিকেলে এ-ঘর ও-ঘর ঘুরে বাবার প্রিয় পড়ার ঘরে গিয়ে তার আরাম কেদারায় বসল সে। মস্তবড় পুরনো দেরাজ-টেবিলটা ঠিক পাশে দাঁড়িয়ে। তার ওপরে রাখা টুকিটাকি জিনিষের মধ্যে বাবার তামাকের পাইপ আর মার সাদাকালো ছবিখানা রাখা। শীত বেড়েছে এসময়ে। যেন অস্পষ্ট স্মৃতির মত বাইরের কুয়াশা ঘন হয়ে আসছে। সন্ধ্যেটা যেন একটু বেশী নিঃস্তব্ধ সেদিন।

কি ভেবে আস্তে আস্তে উঠে দাঁড়ালো জোহান, এগিয়ে গেল পায়ে পায়ে ভারী টেবিলটার সামনে। চায়ের কাপ হাতে এলমা সবে এসে ঢুকেছে ততক্ষণে ঘরে। সেও এসে দাঁড়ালো প্রিয় মানুষটির পাশে। একটা একটা করে দেরাজ খুলতে শুরু করল জোহান। নানা কাগজপত্র, বাড়ির জরুরী নথিপত্র, আর টুকিটাকির মধ্যে প্রথম জিনিষ যেটা চমকে দিল জোহানকে সেটা হচ্ছে তার বার্লিন অ্যাকাডেমিতে স্নাতক উপাধিলাভ ফটোটির প্রতিলিপি। এটা এখানে এলো কি করে, আকাশ থেকে পড়ল জোহান! বাবা না তো এসে পৌঁছতে পেরেছিলেন সেদিন, না তো জোহান পাঠিয়েছিল এ ফটো তাকে। স্বল্পকথার চিঠিতে খবরটুকুই পাঠানো হয়েছিল শুধু। কবোষ্ণ জবাবে আশীর্বাণী এসে পৌঁছেছিল। কিন্তু এটা ফটো হলেও অল্প একটু ঝাপসা, যেন ইন্টারনেট থেকে ছাপিয়ে নেওয়া হয়েছে ছবিখানা ! ড্রয়ারের এই ফটোর তলাতে পরতে পরতে আরও বিস্ময় জমে রয়েছে। জোহানের ছোটবেলার স্কুলের মিউজিক ক্লাসের সার্টিফিকেট, এমনকি বার্লিন অ্যাকাডেমিতে ভর্তিরপুরনো রসিদখানাও রক্ষিত আছে। কিন্তু এ কি দেখছে জোহান- তার অনুষ্ঠানেরএত টিকিট এভাবে গুছিয়ে রাখা রয়েছে কেন ? নীচের ড্রয়ার থেকে ততক্ষণে হাতে হাতে অনেকগুলো মিউজিক অ্যালবামটেনে বের করেছে এলমা। জোহানের প্রতিটি মিউজিক অ্যালবামের ওপর রিলিজের তারিখ লিখে রেখেছে এক চেনা হাতের লেখা। ড্রয়ার ভর্তি জোহানের ছবিতে কোথাও সে অপেক্ষাকৃত তরুণ, নতুন গীটার হাতে দাঁড়িয়ে, কোথাও বা এলমার সাথে বার্লিনে হাভেল নদীর ধারে দাঁড়িয়ে প্রেমময় আবেশে একাত্ম । বেশ কিছু ফটো তাদের দুজনের রাইন-নদীতে ভ্রমণের সময়  তোলা। এই মধুচন্দ্রিমা যাপনের কথাটাবাবাকে তো বিশদ বিবরণে জানানোও হয়নি জোহানের।সবশেষে পাওয়া গেল একখানা মোটা খাতা। জোহানের সব কয়টি অনুষ্ঠানের ছবি তার মধ্যে তারিখ দিয়ে পরপর যত্নে সাজিয়ে রাখা। শেষপাতায় পৌঁছে একদম থমকে গেল জোহান। অদ্ভুত ব্যাপার, পাঁচটি অক্ষর ও চারটি নম্বর মিলিয়ে ঠিক যেন একটি সাংকেতিক পাসওয়র্‌ড লিখে রাখা রয়েছে। অক্ষরগুলিতে জোহানের নাম সাজানো, নম্বরের জায়গায় তার জন্মের বছরখানা লেখা। বাবার শোয়ার ঘরে দৌড়ে গেল জোহান তাঁর পুরনো ডেস্কটপ কম্পুটারখানা খুঁজতে। বাবার বন্ধুরা বেলেছিল শেষ কয়েকমাস ডমিনিক এই ঘর থেকে আর বিশেষ বেরোতেন না। কি ভেবে সেই অদ্ভুত পাসওয়র্‌ড দিয়ে যন্ত্রটাকে জাগিয়েতুললজোহান। যন্ত্র কথা বলে উঠল, বলতে শুরু করল বিগত প্রায় এক দশকের ঘটনাবলী। লেকের ধারে দাঁড়ানো দূর থেকে তোলা সাইমনের ছবি ফুটে উঠল ফেসবুকের দেওয়ালে। সাইমন হয়ে জোহান দেখতে শুরু করল নিজেকে,দেখতে শুরু করল তার নিজের ছাত্রজীবন, তার বাবা ডমিনিকের উদাসীনতা নিয়ে তার নিজস্ব বিরক্তি ও হতাশার স্বীকারোক্তি, এলমার প্রতি আকর্ষণের দিনগুলো, রাইন ক্রুইসের সুন্দর সময়, নানা অনুষ্ঠান ও জনপ্রিয়তার শিখরে ওঠার ছবি।


মাসচারেক পরে জন্ম হোল জোহান-এলমার প্রথম সন্তানের। নাম রাখা হোল সাইমন জোহান ক্রাউস।

About