এই সংখ্যার লেখকসূচি - নীহার চক্রবর্তী, রুখসানা কাজল, সোনালি ভট্টাচার্য মুখার্জী, মৌসুমী ঘোষ দাস, সৌমেন্দ্র লাহিড়ী, শাশ্বতী সরকার, মনোজিৎ কুমার দাস, শিখা কর্মকার ও সুনীতি দেবনাথ । 

মেটামর্ফিক পোট্রেট / সীমা ব্যানার্জী রায়

আলোচক – ফাল্গুনী মুখোপাধ্যায়

সীমা ব্যানার্জী রায়ের প্রথম উপন্যাস ‘মেটামর্ফিক পোট্রেট’ পড়লাম । প্রথম উপন্যাসের ক্ষেত্রে নেকেরই লেখায় কিছু আড়োষ্টতা দেখা যায়, সীমার ১১৮পৃষ্ঠার উপন্যাসটিতে আমি কিন্তু কোন আড়ষ্টতা পেলাম না। শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত বেশ সাবলীল আগ্রহ-সঞ্চারি লেখা । সীমা তার উপন্যাসে চার নারী চরিত্র ও এক পুরুষ চরিত্রের ছবি আমাদের সামনে এনেছেন । কিন্তু আমার বিশ্লেষণে সীমা একটিই পোট্রেট এঁকেছেন, তাঁর উপন্যাসের কেন্দ্রীয় চরিত্র দীপ্তর পূর্ণাবয়ব ‘পোট্রেট’ । তার জীবনের টানা-পোড়েনই সীমা ব্যানার্জী রায়ের আঁকা ‘মেটামর্ফিক পোট্রেট’।

নিতান্ত শৈশবে পিতৃহারা দীপ্ত চরম দারিদ্রের মধ্যেও মা মৃদুলা দেবীর স্নেহ ও পরিচর্যায় এবং আপন মেধায় উচ্চশিক্ষিত হয়ে আমেরিকা প্রবাসী হয়ে উচ্চপদে প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন । দীপ্তর প্রথম প্রেম পূর্ণতা পায়নি, তার জোবনে আসা প্রথম নারী তার জন্য অপেক্ষা করেনি । দ্বিতীয় নারী পরমা দীপ্তকে ভেঙে চুরমার করেছেন পরপুরুষে আসক্ত হয়ে । আর তৃতীয় নারী দীপ্তর দ্বিতীয় স্ত্রী, প্রথম বিবাহ-বিচ্ছিন্না আপান নিজে কিছু না পেয়েও আবার গড়লেন দীপ্তকে । মৃত্যু আপানকে টেনে নেওয়ার আগে ‘দীপ্তর চার অধ্যায়’ নামে নারীজীবনের চার চরিত্রে কাহিনী । দীপ্তও তখন জীবনের উপান্তে পৌছেছে । আপান তার ‘চার অধ্যায়’ কাহিনীর শেষ পৃষ্ঠায় লিখেছিল “এই উপন্যাস পাঠ করে যদি একজনও বিবাহ-বিচ্ছেদকে ত্যাগ করতে পারেন তাহলে আমার এই লেখার সার্থকতা”। বইটা বুকে চেপে ধরে হাহাকার করে ওঠে দীপ্ত “বিনা দোষে সবাই আমাকে ছেড়ে চলে যাচ্ছো কেন সবাই ?” হয়তো ক্ষণিকের জন্যও তার দুই সন্তানের জননী তাকে ভেঙ্গে চুরমার করে চলে যাওয়া পরমার কথাও মনে পড়েছিল দীপ্তর । এই কাহিনীনির্যাসেই সীমার প্রথম উপন্যাস ‘মেটামর্ফিক পোট্রেট’ ।

লেখিকা গত ২৯ বছর ধরে আমেরিকার টেক্সাস প্রবাসী, কিন্তু বাংলার জল-হাওয়ার আবহে লালিত মূল্যবোধ আর সংবেদনশীলতা কিছুমাত্র বর্জিত হয়নি তার ব্যক্তিগত জীবনচর্যায়, সেটা বোঝাযায় উপন্যাসটির চরিত্র নির্মাণ ও বিন্যাসে । আমার মনে হয়েছে স্বামী-স্ত্রীর পরীক্ষিত ভালোবাসার পরেও বিবাহ বিচ্ছেদ কেন অনিবার্য হয়ে যায় সেই প্রশ্নের উত্তরের অন্বেষণই এই উপন্যাসের সারাৎসার ।

দীপ্তর মা মৃদুলা দেবী এবং প্রথম স্ত্রী পরমা দুটি ভিন্ন ধরণের চরিত্র । মৃদুলা চরম দারিদ্রের সঙ্গে লড়াই করে তার সন্তানদের মানুষ করেছেন, প্রতিষ্ঠিত করেছেন আর পরমা কুড়ি বছর বিবাহিত জীবনের পরেও আর এক পুরুষের টানে দীপ্তকে ছেড়ে চলে গিয়েছিল দুই সন্তানকে সেই বিচ্ছেদ কতটা প্রভাবিত করবে তা না ভেবেই । সুখী হয়নি পরমা মোটেই, পেয়েছিল স্বামীর ঘর ছাড়া উৎশৃঙ্খল ব্যাভিচারির পরিচিতি । আবার দীপ্তর দ্বিতীয় স্ত্রী স্বামীর সন্দেহ ও মানসিক নির্যাতনে বিবাহ বিচ্ছিন্না আপান দীপ্তকে বিয়ে করে সুখী হয় । নারীর পরম কামনা সন্তানও চায়নি দীপ্তর কাছ থেকে । পরমা-দীপ্তর দুই সন্তানের মা হিসাবেই নিজেকে তৈরি করেছিলেন । দীপ্তর ভালোবাসার জীবনে আসা তিন নারী রূপসা, পরমা ও আপানের চরিত্রনির্মাণ, বিন্যাস আর সম্পর্কের নানান টানা-পোড়েন পাঠকের আগ্রহ সঞ্চার করবে বলেই আমার বিশ্বাস । সেই বিশ্বাস থেকেই বলি সীমার প্রথম উপন্যাস ‘মেটামর্ফিক পোট্রেট’ পাঠক সমাদর লাভ করবে ।

আর একটা কথা বলে নিই । কাগজ, ছাপা, বোর্ড বাঁধাই, মারুত কাশ্যপ কৃত শোভন প্রচ্ছদ – সব মিলিয়ে ‘মেটামর্ফিক পোট্রেট’ বেশ যত্নশীল প্রকাশনা ।


ফুরায় শুধু চোখে

বুড়ো হরলাল এখনো নিজেকে তার পাড়ার মাথা বলে মনে করে । সব ব্যাপারে আগে ছোটে । কান খাঁড়া করে সব শুনে নিজের মত জানায় । তার মতগুলো এ যুগের মতো নয় । আগের বিশ্বাস নাকি এ যুগ চলে না । তাই নাকচ হয়ে যায় তার সব কথা । হরলাল হাসতে হাসতে বাড়ি ফিরে নিজের স্ত্রীকে বলে,সব মরুক গা । স্ত্রী মুখ-ভার করে বলে ওঠে,তোমার সম্মান বলে কিছু নেই ? যাও কেন ওদের মধ্যে,শুনি ?
হরলাল ফোকলা হেসে উত্তর দেয়,অতীত আর স্মৃতির কোন সম্মান আছে ? নেই বলেই তো কারো পিছু ছাড়ে না । আমি সেই অতীত আর স্মৃতির প্রতিনিধি । কেউ আমাকে থামাতে পারবে না ।
সেদিন জিতে গেলো হরলাল । তার পাড়ায় এক প্রবীণ মানুষ কেষ্ট দত্ত মধু ঢালীর মেয়ের উঁচু বুকে রাতের অন্ধকারে মোলায়েম করে হাত দিয়েছে । সে নিয়েই কথা হচ্ছিলো । হরলালের থেকে কেষ্ট দত্ত বছর পাঁচেকের ছোটো হবে । তাই সবাই মিলে হরলালকেই চেপে ধরল । রাগত-স্বরে তাকে বলা হল,’’আপনি কী বলেন এ ব্যাপারে ?
শুনে হরলাল একচোট হেসে বলে উঠলো,দোষ আমি কেষ্টর দেখছি না । মধু ঢালীর মেয়ের উঁচু বুক থেকে অতীত নড়ে উঠতেই পারে । এমনই সে । বিদেয় দিলেও আবার ফিরে আসে । এই আমার মতো । তার কথা শুনে তরুণ যুবক দিনেশ বলে,এর মানে কী ? আপনি কেষ্ট হারামির পক্ষে ?
হরলাল সহাস্যে জবাব দেয়,বিপক্ষে তো নয়ই । কীভাবে হওয়া যায় ? আমি পুরনো মানুষ । পুরনোদের নিয়েই চলতে ভালোবাসি । আমার অমন ইচ্ছে হবে কিনা বলতে পারছি না । এ যুগ যত অপমান করবে অতীতকে,ততই সে ফুঁসে উঠবে তার কথা বিলক্ষণ বুঝল হরলালের প্রতিবেশী রাখাল দাস । তাই সে উত্তর দিলো বলিষ্ঠ-কণ্ঠে,যুগ ভাগ কর না কেউ । অমৃত আর গরল বুঝতে সবাই একসাথে হও । নইলে কপালে সবার কষ্ট আছে । হরলালদাকে তোমরা তো মানুষ বলেই ভাবো না । দেখিনি বুঝি আমি ? তার কথা শুনে অনেকেই লজ্জা পেয়ে মাথা নিচু করলো ।
হরলাল রাখাল দাসের কাঁধে হাত দিয়ে বাড়ির দিকে আসতে আসতে বলল,বেশ বলেছ,ভাই । তবে আমি আর ওদের মধ্যে যাবো না । আমাকেই কোনোদিন কেষ্ট দত্তর লোক বুঝে পিটুনি দেবে । তার কথায় সহমত হয়ে রাখাল দাস বলল সখেদে,হ্যাঁ,দাদা । আর নয় । এখনো সম্মান বলে তো আপনার কিছু আছে

অচিন-জননী

শিবেন মিত্তির গলি মানেই পতিতাদের গলি । একটু বেলা বাড়া থেকে সন্ধে পর্যন্ত মেয়েরা গলির মোড়ে দাঁড়িয়ে থাকে সেজে-গুজে । ওদের মাঝে এক বুড়ী মতো মহিলাকেও দেখা যায় । অসিত অফিসে আসতে-যেতে তাকে দেখে । কখনো দেখা যায় সে হাসি-খুশি । কখনো বা খুব বিষণ্ণ । অসিত দেখে খুব অবাক হয় । তার ব্যাপারে ওর উৎসাহ খুব বেশী । কিন্তু অত মেয়ের মাঝে তার কাছে যেতে ও সাহস পায় না ।
কিন্তু অসিতের আগ্রহ দিনের পর দিন বাড়তে থাকে । মার কাছে এসে বলে সেই বুড়ীর কথা । ওর মা শুনে হাসে । অসিতকে বলে,একদিন বুড়ী-মার সঙ্গে কথা বলতেই পারিস । তুই তো আর... কিন্তু মার কথায় কোনোরকম বুকে বল পায় না ও । আমতা আমতা করে বলে,বোঝোই তো সব । অনেক চেনা মানুষ ও পথ দিয়ে যায় । মা বুঝে এক-মুখ হেসে বলে,তবে দূর থেকে তাকে প্রণাম জানাস । তোর দিদিমা-ঠাকুমার মতো হবে না ?’’ মার কথা শুনে অসিত খুব খুশী হয়ে বলে,সে হবে,মা । খুব প্রণাম করতে ইচ্ছে হয় বুড়ী-মাকে । তুমি তো দেখোনি তাকে । কেমন করে বসে থাকে যে ।
একথার পর বেশ কয়েকদিন অসিত আর বুড়ী-মাকে গলির মোড়ে দেখল না । খুব বিস্মিত হল । মনে খুব আঘাত পেলো ও । তবু প্রতিদিনের মতো মাথায় আঙুল ঠেকাতে ভুলল না । একদিন ওর মাথায় আঙুল ঠেকানো দেখে এক মেয়ে পথে উঠে এলো । অসিতের মুখোমুখি হয়ে স্মিত হেসে জিজ্ঞেস করলো,কাকে রোজ ভক্তি দেখাও ? আমরা নিশ্চয় কেউ নই ? কোনোদিক দিক থেকেই আমরা নই । না বয়সে,না সম্মানে । তাহলে কে গো ? বল না একবারটি ।
অসিত পথের পাশে উঠে এলো তারপর । মেয়েটাও এলো ওর সঙ্গে । এরপর চারদিকে একবার তাকিয়ে নিয়ে অসিত বলল মেয়েটাকে,সেই বুড়ী-মা কোথায় ? কদিন থেকে দেখি না যে । খুব ভালো লাগতো তাকে । বিশ্বাস কর আমাকে । আমার ঠাকুমার মতো বেশ খানিকটা । কোথায় সে ? অসিতের কথা শুনে মেয়েটার দুচোখ জলে ভরে গেলো । তার গাল বেয়ে টপটপ করে জল পড়তে থাকলো । দেখে অসিত প্রমাদ গুণতে শুরু করলো । বুঝল নির্ঘাত বুড়ী-মা আর নেই ।
তিনি তো কদিন আগেই মারা গেছেন । সে আপনি কী করে জানবেন ? আমাদের খুব ভালবাসতেন তিনি । হ্যাঁ,আপনার কথাও বলেছেন কয়েকবার । বলতেন দেখেই বোঝা যায় খুব ভদ্র ঘরের ছেলে হবে । তার জন্য আমরাও আপনাকে চিনে ফেলেছিলাম । নিজেদের মধ্যে আপনাকে দাদাই বলতাম । বিশ্বাস করুন ।
মেয়েটা একনাগাড়ে কথা বলার পর রুমাল দিয়ে তার চোখ মুছল । মুখে তার কষ্টের হাসি । অসিত কি বলবে আর কি করবে বুঝে উঠতে পারলো না । হঠাৎ ওর মুখ থেকে বেরিয়ে এলো,ওনার কাজ হয়ে গেছে ? আমি কিছু সাহায্য করতে পারি ? সাথে-সাথে মেয়েটা বলে উঠলো বেশ বলিষ্ঠ কণ্ঠে,আমরা এখানে শরীর বেচে পয়সা নিই । তুমি তো সে ধরণের মানুষ নও । আসি ।
মেয়েটা খুব দ্রুত তার জায়গায় আবার ফিরে গেলো । তারপর রঙ-তামাশা শুরু করলো সঙ্গিনীদের সাথে । আর হাতছানি দিক-দিগন্তরে । অনেকক্ষণ হাঁ করে সেদিকে চেয়ে অসিত হাতের ঘড়ি দেখল । অফিসের সময় পেরিয়ে গেছে ওর । এবার তাই ঘরেই ফিরে যেতে হবে ওকে । আর এরপরেও অফিসে গেলে বুঝি ওর সবকিছুই মিথ্যা হয়ে যাবে ঈশ্বরের কাছে ।


একটা বাজে মেয়ের গল্প


মেয়েটা রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকত। বসে ও থাকত অনেক সময়।পাঁচিলের ওপরে বসে বসে পা দোলাতো,আর অলস ভাবে ঘাড় ঘোরাতো এ দিক ও দিক।ট্রাফিকই দেখত ফাঁকা সময়ে। চেতলা ব্রিজের পাঁচিল তো।সামনেই অনেক ট্রাফিক। খদ্দের এল ত ভাল।দুটো পয়সা পাওয়া। কিন্ত দুটো এই পয়সার জন্য যা খাটুনি। বাবা। মাঝে মাঝে মনে হয় আজকের দিনটা খদ্দের না এলে বাঁচি। আবার নিজেই পা দোলাতে দোলাতে মুখ বেঁকায়। হ্যাঁ,গতরে হাওয়া লাগিয়ে আরাম কল্লে খেতে দেবে কার শাঊড়ি, হুঁঃ তবু রাস্তায় বসে থাকা ভাল। খোলা হাওয়া। মানুষজন।গাড়ি ঘোড়া।এইখানে কলকাতা সুন্দর। তার বনগাঁ বর্ডারের টালির চাল,আর কাদা মেখে খেতে ধান রোয়ার চেয়ে সুন্দর। সামনে হেই দেখো বিশাল কাপড় না কাগজ টাংগানো। সেদিন একটা বাবু কাস্টমার বল্ল হোডিন।সেই খানে করিনা কাপুরের যা হেব্বি ছবি না একটা। কি লাল লিপিস্টিক,চোখে লাইনার,বুকের খাঁজ দেখাচ্ছে কায়দা করে। বেশি রেটের মেয়েরা দরোয়ানকে দিয়ে আনিয়ে ভিডিও দেখে। আবার সকালে কেবলেও সিনেমা দেখায় মাঝে মাঝে বাড়িউলি বুড়ি।মেজাজ ভাল থাকলে। সেই করেই সিনেমার লোকেদের নাম ধাম চেনা। ঘরে ঢুকলে তবেই রোজগার। নাহ,একা ঢুকলে হবে না।খদ্দের কে লিয়ে ঢুকতে হবে।যার যত বেশি খদ্দের তার তত পয়সা। 

দমবন্ধ হয়ে আসে এক ফালি কুঠুরিটাতে ঢুকতে। মাথা নামিয়ে কোন রকমে ভিতরের খাটে ডাইভ মারা। একটু নড়াচড়া করার ও জায়গা নেই। সে কপাল করে আসেনি মেয়েটা। নেহাত গরিব চাষা বাড়ির মেয়ে।মুখখানার বিশেষ ছিরিছাঁদ নাই।শরিলটা আঁটোশাঁটো দেখেই চিড়িয়াখানায় বাড়ির লোকের থেকে আলাদা হয়ে যাওয়ায় হারামি হরিদাস ওকে পটিয়ে এনেছিল। সে কোন ছেলে বেলার কথা। খদ্দেরের ঘরে ঢোকাতে কি মার কি মার।আবছা আবছা মনে পড়ে একা বসে থাকলে।কারো ইচ্ছে করে ওই চোরাকুঠুরিটাতে ঢুকতে? খদ্দের গুনো ও কি বাবা! চারটে দেয়াল আর একটা চিত করে ফেলবার তক্তা হলেই হয়ে যায়? না।সবাই এরম নয় অবস্যি।দেখো না, আশে পাশে কত এসি ফ্ল্যাট ও হয়েচে আজকাল।পয়সা ফেলো আরাম কর।উঁচু লজরের লোক ও আছে। তবে তারা এরম খেঁদাবোচা মুখ,খসখসে মেয়ে মানুষকে পয়সা দেবে না।কত ইংরিজি বলা নেপালি পাঞ্জাবির দল পয়সা পিটছে এন্তার। যাকগে। ফোঁস করে দীর্ঘশ্বাস ফেলে দার্শনিক হয় মেয়েটা। ওই হোডিন বলতে শিখিয়ে যাওয়া বাবুটাকে সেদিন বেশ দিয়েছি। মাল খেয়ে ত আউট। কিসুই বিশেষ করতে পারেনি।খালি বুকনি। নিজের সম্মান নিয়ে ভাব? নিজেকে মেয়ে বলে সম্মান দাও,ভ্যানোর ভ্যানোর ভ্যানোর। অনেক শুনে আর থাকতে পারিনি। বল্লাম,বাবু, যদি পঞ্চাশ টাকা ঘন্টা না লিয়ে নিজের দাম বাড়ানোর রাস্তা থাকত তবে লাখ টাকা ঘন্টা নিতাম। বলে,আহ এটা একটা কথা? একটু উপরে ওঠার কথা ভাবতে পার না? বোঝো কথা। বল্লাম, সেই ত ভাবছি। লাখ টাকা ঘন্টা নিলে তোমরা আমার নাম দিতে করিনা কাপুর।তখন আমার খালি গায়ের ছবি হোওই সে হোডিন এ চিত হয়ে দেখে মুগ্ধ হয়ে যেতে। 

কেমন চমকে তাকিয়ে রইল লোকটা।তারপর ব্যাগে যত যা ছিল বের করে আমার হাতে গুঁজে দিয়ে মাথা নিচু করে বেরিয়ে গেল। চড়থাপ্পড় ও মারেনি,চুল টানেনি, কিচ্ছু না। মাসিকে বলিনি। অনেকগুলি টাকা। নাহ।ভগমানের মাঝেমাঝে বোধহয় আমাদের কথাও মনে পড়ে যায়।
পিতা

নীল কাভারের সোফায় বসে দীর্ঘ ভারী নীলপর্দার দিকে তাকিয়ে আছে মুক্তি।একটু আগে পর্দার কিছু অংশ নিঃশব্দে টেনে সরিয়ে দিয়েছে। পর্দার ওপাশে   কেবল কারো চাদর ঢাকা ক্ষীণ পায়ের কিছুটা দেখা যাচ্ছে। মুক্তির দৃষ্টি সেদিকেই   নির্নিমেষবদ্ধ। অই পায়ের সামান্য নড়াচড়ায় সে ক্ষিপ্র উঠে দাঁড়ায়,  পাঁজরে পাঁজরে রক্ত বাড়ি খায়, বোঝে, বেঁচে আছে আব্বা বেঁচে আছে!  
কালিবালি সন্ধ্যা নেমেছে। এখুনি মাগরিবের আজান হবে। আজান শেষে এই সময় মুক্তির অদম্য ক্ষুধা পায়। বহু বছরের অভ্যাস। সারাদিন কিছুই খায় না সে। স্রেফ জল খেয়ে দিব্যি কাজ করে যায়। কিন্তু এই সময়ে আর পারে না। প্রচন্ড ক্ষুধায় নাড়িভুঁড়ি ঘুরছে। তবু মুক্তি বসে থাকে।আজ সে না খেয়েই থাকবে। অসুস্থ মানুষটাকে একা রেখে কিছুতেই সে খেতে যেতে পারবে না। 
  
 এক আজান শেষ না হতেই আরেক আজান সুর তুলেছে। কিছুই বোঝা যাচ্ছে না।ঢাকা শহরে এত মসজিদ!একই পাড়ায় অনেকগুলো। নামাজীদের সংখ্যাও অগুনতি। আজানের যে পবিত্র আহবান ভাল করে বোঝাও যায়না।এক মসজিদের আজান অন্য মসজিদের আজানের সাথে কাড়াকাড়ি মাখামাখি করে শেষ হয়ে যায়। আব্বা বলেন যেখানে পাপ বেশি সেখান ধর্মস্থান নাকি বেশি থাকে!    
“মুক্তি!” চমকে ভারী শরীরে চপল বালকের মত দ্রুত ফাঁকা পর্দার মাঝখানে এসে উত্তর দেয়, জি আব্বা।” “একটু চা খাওয়াবি বাপ! মন বড় চাইছে রে!” মুক্তি অসহায় হয়ে পড়ে। বাপটার ক্যান্সার জেনে গেছে সে। সময়ও বেঁধে দিয়েছে ডাক্তাররা। বাঁধাধরা খাওয়ার লিস্ট। এমন রোগীকে কি চা দেওয়া যায়? যদি ডাক্তাররা রাগ করে? যদি অসুখ আরো বেড়ে যায়?যদি ধরাবাঁধা  দিনের আগেই তার বাপটা মরে যায় ?পাহাড়ের মত শরীর নিয়ে মহাসংকটে পড়ে  মুক্তি। কি করবে সে ? চা না খেয়েই যদি বাপটা মরে যায়? সামান্য চা! বাপটাকে তাও  সে দিতে পারল না এই ভেবে কি সে বেঁচে থাকতে পারবে?মুক্তির উঁচু উঁচু দাঁতগুলো   কিছু না করতে পারার সংকটে তীব্র হয়ে ঠোঁট ঢেকে আরো বেশি বেরিয়ে আসে। কাশেম সাহেব বহু কষ্টে ঘাড় ঘুরিয়ে মুক্তিকে দেখেন। একরাশ মায়ায় তার মন ভিজে  উঠে, সঙ্গীতা কই রে ?” “বাসায় গেছে। শরীর কি খারাপ লাগছে আব্বা?” “না রে বাপ।কাছে আয় । অত দূরে দাঁড়িয়ে আছিস যে? আমার কি ছোঁয়াচে রোগ হয়েছে নাকি! আর এই পর্দা সরা।”

পর্দা সরিয়ে কাছে আসে মুক্তি। কাশেম সাহেব ষড়যন্ত্র করছে এরকম সুরে বলেন, যা তুই খেয়ে আয়। আর আসার সময় এক গ্লাস দুধ চা আনবি। বাপ বেটা ভাগ করে খাব বুঝলি।” খুব খুশী হয়ে উঠে মুক্তি ।আব্বার শরীর কি তবে ভাল হয়ে যাচ্ছে? বড়  ডাক্তার সংগীতাকে বলেছে, মিরাক্যাল হতে পারে। দু মাসের জায়গায় উনি হয়ত দুবছর বেঁচে গেলেন!” বিপ্লব আর সংগীতা মুক্তিকে জড়িয়ে কেঁদে  ফেলেছিল, বড় ভাইজান তোমার আব্বা যেন তাই বেঁচে থাকে।” খুশি খুশি গলায়  মুক্তি বলে, সংগীতা আসুক আব্বা তারপর —

কাশেম সাহেবের বুকের ভেতর কুলকুল হাসি উঠে। হায়রে ছেলের বুদ্ধি! তার নিরেট বোকা মুক্তি কিছুতেই বুঝতে পারে না সংগীতা এলে সে চা খেতে পারবে না। সংগীতা তার মেয়ে হলেও ডাক্তার। সে চোখ পাকিয়ে বলবে, নো চা কফি ।সুস্থ হলে সব হবে!বড় ভাইজান তোমার আব্বা কথা না শুনলে আমি কিন্তু চিকিতসা করব না বলে দিলাম।” মুক্তি তখন মূর্তি হয়ে যাবে। খাওয়া দাওয়া ছেড়ে ঠাঁয় বসে থাকবে তার কাছে । তিনি জানেন মাগরিবের আজান শেষ হলেই রাক্ষুসে  ক্ষুধা পায় মুক্তির। মূহূর্তে খেয়ে ফেলে দুই প্লেট ভাত। তারপর ধীরে সুস্থে শান্তিমত খায় ।
     
           রাহেলা খুব যত্ন করে মুক্তিকে খেতে দিতেন । মুক্তির দেহের আড়ালে ঢাকা পড়ে যেত ছোটখাটো দেহটি।মুক্তি গলে পড়ত মায়ের সামনে।চমচের পর চামচ খাবার তুলে তিনি বলতেন, পেট ভরে খা বাপ। এত কাজ করিস।কি করে তুই সারা দুপুর না খেয়ে থাকিস আমি বুঝি না রে।” মুক্তি খেত আর হেসে হেসে মাকে বলত, দুপুরে খেলে শরীর ভারী ভারী লাগে। ঘুম পায়। ঘুমুলে কে কাজ করবে ? আমাদের ত অইটুকুই জমি! আব্বা তো আর জমি কিনবে না।” শেষের কথাটি অভিমান ভরা। কাশেম সাহেব জমি কেনার পক্ষপাতী নন। যে টুকু জমি আছে তার সবটুকু পাবে মুক্তি। সঙ্গীতা আর বিপ্লব খুশিমনে বড় ভাইকে ওই জমি বাড়ি লিখে দিয়েছে। মুক্তি জানে না। সে জমি খুব ভালবাসে। অন্যের জমি অযত্ন হচ্ছে দেখলেও ভয়ংকর রেগে যায়। জমির মাটি, ফসলের আগাছা, জলসেচ, নিড়ানি সব কিছুতে মুক্তির চরম উৎসাহ। গান গায় আর ছন্দে ছন্দে কাজ করে। মুক্তির হাতের আঘাতে বড় বড়  মাটির ঢেলা অনায়াসে ভেঙ্গে পড়ে। লাঙলের ফলা দেবে যায় মৃন্ময়ী মাটির বুকে।মুক্তি চরম শক্তিতে ছেনে নিয়ে আসে মাটি মায়ের বুকের নির্যাস। যেন অই বুকের দুধ মুক্তির জন্মের শোধ। 
 
            একজন আয়াকে কেবিনে রেখে ক্যান্টিনে আসে মুক্তি। চেনা কর্মচারী মুক্তির খাবার দেখিয়ে দেয়।চারজনের মত খাবার রাখা আছে। সংগীতা ব্যবস্থা করে গেছে। জানে সারাদিন বাদে এই সময় বড়ভাইজান পেটভরে ভাত খায়।মন খারাপ  করে বাসায় গেছে সঙ্গীতা। হাসপাতালের এই ক্যান্টিনে কতবার খেয়েছে সে। পাবনা থেকে সোজা চলে আসত এখানে। সংগীতা এখানকার ডাক্তার। বড় ভাইকে দেখলে আন্তরিক খুশী হত সে। ছোটভাই বিপ্লবের বউও ডাক্তার। সাথে সাথে বিপ্লব জেনে যেত বড় ভাইজান ঢাকা এসেছে। আর ফোনে চেঁচামেচি ঝগড়া অনুযোগ অভিমান শুরু করত। সংগীতার ওখান থেকে বিপ্লবের বাসা ঘুরে আসত সে। তাদের বড়  সুখের সংসার। তিন ভাইবোন ত্রিরত্ন। আম্মা নেই। দুবছর আগে মারা গেছেন। এখন মুক্তিই সব। বিপ্লবের বউ টেবিলে খাবার দিয়ে দু ভাইয়ের বকবক শুনে হাসে আর ভাবে, কে বলবে মুক্তি ভাইজান এদের রক্তের কেউ নয়? 

            বাহাত্তর সালের মার্চ মাস। ছিন্নভিন্ন বাংলাদেশে একমাত্র মাথা উঁচু করে দুলছে স্বাধীন বাংলার লালসবুজ পতাকা। কাশেমরা অস্ত্র জমা দেবে কি দেবে না ভাবছে। এত তাড়াতাড়ি দেশের স্বাধীনতা আসবে ভাবেনি কেউ। আরো বৃহৎ যুদ্ধেরজন্যেমানসিকপ্রস্তুতিনিচ্ছিল ওরা। চীনের ভূমিকায় যুদ্ধের প্রথম দিকে বেকায়দায় ছিল ওদের দল। শেষ সিদ্ধান্তে যুদ্ধে নেমেছে। তবে ভারতের সাহায্য নিতে নেতাদের মনে লেগেছে। অথচ কাশেমরা পরিষ্কার বুঝেছিল ভারত রাশিয়া ছাড়া বাংলাদেশের পক্ষে এত বলিষ্ঠ আর কেউ নাই। যুদ্ধশেষে নেতৃত্ব জানায় যুদ্ধ এখনো শেষ হয়নি। স্বাধীন বাংলাদেশে পুঁজিপতিজোতদার শোষকদের শেষ করতে হবে। টালমাটাল মনের অবস্থা । মাগরিবের আজান শেষে চা খাচ্ছে বাড়ির রাখাল ছুটে আসে । পাশের বাসার বাদলদের পুকুরঘাটে একটি নবজাতক ট্যাঁ ট্যাঁ করছে। সন্ধ্যারমুখে শেয়াল কুকুরে ছিঁড়ে খেলে ঝামেলা যাবে এই ভেবে কারা যেন ফেলে গেছে ।

          বাদলরা তখনো ভারতে। ফাঁকা বাড়ি পড়ে আছে জংলা ভুতের মত।  কে ফেলল ? তাদের এই পাড়াতে সবাই সবাইকে চেনে। হিন্দু মুসলিমের পাশাপাশি বাস। ঘর উঠোনে সবার যাতায়াত। দু ঘর হিন্দু পরিবার আছে কাশেমদের বাড়ি  লাগোয়া। কিন্তু তাদের তো কোন মেয়ে নেই! কাশেম তুলে নিয়ে আসে বাচ্চাটাকে। কাশেমের মা বুকে জড়িয়ে ধরে। আহারে কার ধন কে ফেলে গেছে। কাশেমের বাবা দরাজ গলায় চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দেয়, ওরে ও কাশেম  এবার তোর সত্যিকারের যুদ্ধ শুরু হল। দে এখন ছেলেটাকে অন্ন, বস্ত্র, চিকিৎসা, বাসস্থান। তবেই বুঝব তুই সাচ্চা কম্যুনিস্ট ।” কাশেম যেন একটি মহাকাজ পায়। অস্ত্র জমা, আরো এক যুদ্ধ, ভারত বিরোধ সব ফেলে বাচ্চাটিকে নিয়ে মেতে উঠে। নাম রাখে মুক্তি। কাশেমদের ঘরবাড়ি, উঠোন, পুকুর মুক্তিই মুক্তি। কোর্ট অফিসে চাকরি পেয়ে যায় কাশেম। মুক্তির একবছর বয়সে বন্ধুর বোন রাহেলা বেগমকে বিয়ে করে। মুক্তি মা পায়।  কেবল কাশেম তখনো বুঝে উঠতে পারে না কে ফেলে গেল মুক্তিকে ?
 
            বাদলদের পাশের বাসায় সন্তোষ ঘোষের শালীর বিয়ে। অনেক খেটে  খুটে বিয়েটা উতরে দেয় কাশেমরা। বর ভারতের বাসিন্দা। বিয়ে শেষে বর কনেকে তুলে দিতে গিয়ে চমকে উঠে কাশেম। আট বছরের মুক্তির মুখ যেন সন্তোষ ঘোষের শালীর মুখের হুবহু। সেই রকম উঁচু উঁচু দাঁত। মায়াভরা অসহায় চোখ। কিছু  বলতে গিয়েও চেপে যায় সে। আধ ঘোমটার আড়ালে সন্তোষের শালী হাতজোড় করে  একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে কাশেমের দিকে। সে চোখে পদ্মা মেঘনা যমুনা ভাসমান।

             অনেক রাতে সন্তোষ আসে। পাবনার সাঁথিয়ায় সন্তোষের  শ্বশুরবাড়ি। আচমকা মিলিটারী নামে সেই গ্রামে। পালাবার সময় মিলিটারিদের হাতে ধর্ষিত হয় ময়না। চৌদ্দ বছরের মেয়ে মরে গেছে ভেবে ফেলে গেছিল। কিন্তু বেঁচে গিয়েও বা কি হলো! যুদ্ধ শেষের আগেই বোঝা গেল অন্তঃসত্ত্বা ময়না। সন্তোষের বাড়িতেই লুকিয়ে ছিল শেষ ক মাস। বাচ্চাটি বেঁচে যাবে ওরা কেউ ভাবেনি। নুন দিয়েছিল মুখে। কিন্তু পরিমাণ ঠিকমত দিতে পারেনি । “ভাইরে আমরাও চলে যাচ্ছি। মিলিটারীর বাচ্চাকে আর সহ্য  করতে পারছিনা। পারলে গোপন রেখ।” গোপনই  রেখেছে কাশেম। মুক্তি এখন ওর আর রাহেলার বড় ছেলে।জহর মাস্টারের আদরের বড় নাতি। বিপ্লব সংগীতার বড় ভাই। তল্লাটের সবাই জানে রক্তবিপ্লবী কাশেম ওর বাপ। সন্তোষরা চলে যাওয়ার পর বাদলরাও চলে যায়। মুক্তির জন্মস্থান এখন তিনতলা বিল্ডিংএর নীচে চাপা পড়ে গেছে। দু দুবার এইচ এসসি ফেল করে মুক্তি মাকে বলে দিয়েছে, আম্মা আমি আর পড়ব না।” রাহেলা বেগম হতফতিয়ে পড়ে , কি করবি তাইলে বাপ? খাবি কি? আমাদের ত অই চাকরি আর একমুঠো জমি সম্বল!” 
   
            পরদিন সকালে সবাইকে চমকে দিয়ে জমিতে চলে যায় মুক্তি। বিপ্লবের সাথে কি যেন কানাকানি করেছে সারারাত। বিপ্লবও সোৎসাহেএগিয়েদেয়ভাইকে। সংগীতা হা করে চেয়ে থাকে। বড় ভাইজান কৃষক হবে? নিজে নিজে কিষাণ হওয়া যায় একথা তখনো বোঝেনি সংগীতা। রাহেলা বেগম খুব খুশি। সে নিজেও কিষাণ পরিবারের মেয়ে। কেবল কাশেমের বুক কেঁপে উঠেছিল, ছেলেটা পড়ল না ! সে কি তবে ব্যর্থ হল! হেরে গেল না ত জহর মাস্টারের কাছে! তার নিজের ভেতর একটি গোপন গর্ব ছিল একজন যুদ্ধশিশুকে সে প্রতিষ্ঠিত করেছে এই সমাজে এই রাষ্ট্রে । রাহেলা বেগম হাত ঝেড়ে উড়িয়ে দিয়েছিল সব দুঃখ, তোমার বাবাও তো  কিষানের ছেলে ছিল। আমার মুক্তি না হয় তার পুর্বপুরুষের মত কিষানই হল!”
            স্যাঁত করে উঠেছিল কাশেমের মন, পুর্বপুরুষ? কার? মুক্তির? কথাটা জানাতেই রাহেলা বেগমের চোখে আগুন জ্বলেছিল । সে আগুন গলে পড়েছিল জ্বলন্ত লাভা হয়ে, ছিঃ ! কুকড়ে গেছিল কাশেম। তার পিতৃত্বের কোথাও কি ভাঁজ  খেলে গেল পুরাতন বস্তাপচা গন্ধ?
 
            সংগীতা মুক্তি একসাথেই কেবিনে আসে হাসতে হাসতে, আব্বা নিজামী শয়তানেরও ফাঁসী হবে। ইস বিপ্লবভাই থাকলে কি যে খুশি হত!” “কখন আসবে ওরা?”  “সন্ধ্যার প্লেনে। বড়ভাইজান দ্যাখ দ্যাখ ফাঁসির খুশীতে মিছিল বেরিয়ে গেছে!” দুজনেই ছুটে যায় বারান্দায়। কাশেম সাহেব একাত্তরের যুদ্ধকালীন আনন্দ অনুভব করেন।তার ডানহাত হাত শক্ত হয়ে উঠে যেন ট্রিগারে চাপ দিচ্ছেন।



৬৪/বি কালিচরণ লেন                                 
  

রাত একটা বাজে। নিঝুম নিস্তব্ধ ৬৪/বি কালিচরণ লেনের ভাড়া বাড়ির বড় খাটটার ওপর অতিশ গভীর ঘুমে মগ্ন। কিন্তু পারমিতার চোখে ঘুম নেই। ধীরে ধীরে পূবের বড় জানালার কাছে এসে দাঁড়ালো পারমিতা। খোলা জানালা দিয়ে নির্নিমেষে চেয়ে রইলো বাইরের আকাশটার দিকে। সন্ধ্যেবেলার জমাট মেঘটা কেটে যাওয়াতে একটা দুটো করে বেশ কিছু তারা এসে ভিড় জমিয়েছে নিকষ কালো আকাশটার বুকে। কোনটা মিটমিট কোনটা বা স্থির হয়ে আলো দিচ্ছে। ৬৪/বি কালিচরণ লেনের এই বাড়িটাতে আসার পর থেকে কবে যে এভাবে আকাশের দিকে চেয়ে তারা দেখেছে মনে করতে পারলো না পারমিতা।

ছোটবেলায় ছাদে বসে বাবার সাথে প্রথম তারা দেখার শুরু। মনে আছে গরমকালে লোডশেডিং হলে বাবা ছোট্ট পারুকে নিয়ে ছাদে এসে বসতেন। আঙ্গুল দিয়ে দিয়ে তারা চেনাতেন, “ওই দেখ ধ্রুবতারা, ওই লালচে রঙের তারাটা হল মঙ্গলগ্রহ আর সাদা ঝকঝকে উজ্জ্বল যে তারাটা দেখছিস, ওটা হল বৃহস্পতি। আকাশের ওই তারাদের ভিড়ে মিশে আছেন তোর ঠাকুরমা, তোর মা। ওইখান থেকে ওঁনারা আমাদের দেখছেন, আমাদের কথা শুনছেন”।

চোখের কোনটা ভিজে উঠলো পারমিতার! অনেকদিন পর মা-বাবার কথা খুব মনে পড়ছে! খোলা জানালা দিয়ে আকাশের বুকে তারাদের ভিড়ে কেবলি তাঁদের খুঁজে বেড়াচ্ছে! মা সেই কোন ছোটবেলায় আকাশে চলে গেছেন! বাবার কাছেই বেড়ে ওঠা। আর সব মেয়েদের মত মায়ের সঙ্গ পায়নি বলে ছোট থেকেই পারমিতা একটু ভীতু, মুখচোরা, প্রতিবাদ না করে মানিয়ে চলা গোছের মেয়ে। বাবা মেয়েকে যথেষ্ট আগলে রেখেছেন, তবুও মায়ের স্থান তো নিতে পারেন নি। মেয়েলী সমস্যার সমাধানে মায়ের সাহায্য থেকে বঞ্চিত পারমিতা একটু বেশিই নিজেকে গুটিয়ে রাখে।

যদিও আজ বেশি করে বাবার কথাই মনে পড়ছে! এতদিনে সে বুঝে গেছে গুরুজনেরা যা বলেন বা করেন, সবটাই সন্তানের ভালোর জন্য। বাবা প্রথম যেদিন অতিশকে দেখেছিলেন সেদিনই প্রবল আপত্তি করেছিলেন। কিন্তু পারমিতা তখন অতিশের প্রেমে এতটাই উন্মত্ত যে বাবার আপত্তির কথা ভাল তো লাগেইনি বরং যে বাবা পারমিতার জন্য দ্বিতীয় বিয়ে না করে ছোট্ট মেয়েটাকে আঁকড়ে এতদিন বেঁচেছিলেন, সেই বাবাকে নিজের চরম শত্রু বলে মনে করেছিল। আর তারপর একদিন বাবাকে না জানিয়ে মাত্র চার মাসের প্রেমিক অতিশের চাপে কলেজ থেকে বাড়ি না ফিরে, নদীর ধারের কালী মন্দিরে কোনোরকমে বিয়েটা সেরে সোজা এসে উঠেছিল ৬৪/বি কালিচরণ লেনের অতিশের ছোট্ট এই ভাড়া বাড়িতে।

তখন অতিশ একটি রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্কের চতুর্থ শ্রেণির কর্মী ছিল। পারমিতা সবে কলেজের প্রথম বর্ষ। পরবর্তীতে অতিশ বিভাগীয় পরীক্ষা দিয়ে তৃতীয় শ্রেণির কর্মীতে প্রোমোশন পায়। কিন্তু পারমিতা আর পড়াশুনা করেনি। এদিকে এভাবে বিয়ে করার জন্য বাবার সাথে অনেকদিন যোগাযোগ ছিল না ওদের। তারপর অভিমান করে থাকতে না পেরে এক বিকেলে স্নেহ বৎসল বাবা নিজেই এসেছিলেন একমাত্র মেয়ের বাড়িতে। তারপর থেকে আসা যাওয়া শুরু হলেও অতিশ কোনোদিন পারমিতার বাবাকে ভাল চোখে দেখেনি। পারমিতাকেও বাবার বাড়ি যেতে দিত না। যদিও ঘরের বাইরের লোকের কাছে অতিশ খুব নম্র ভদ্র ছেলে হিসেবে পরিচিত! মাথা নিচু করে পথ চলে। কারো সাথে কোন ঝামেলায় নেই ।স্ত্রী ছাড়া কোন মহিলার দিকে চোখ তুলে চায় না।

তা প্রথম দিকে পারমিতাও স্বামীর চাকরি, স্বভাব নিয়ে খুব অহংকার করতো। বিশেষ করে নিজের স্ত্রী ছাড়া কোন মহিলার দিকে চোখ তুলে চায় না, বাড়িতে ফিরেই স্ত্রীকে নিয়ে আদরে মেতে ওঠে। সে স্বামীর ঘরণী মানে স্বামী সোহাগিনী! আর কোন মেয়েই বা স্বামী সোহাগিনী হতে চায় না! কিন্তু ধীরে ধীরে অতিশের দিনের বেলার নম্র ভদ্র রুপটা সরেগিয়ে রাতের অন্ধকারে বন্ধ ঘরের ভেতর একটা জানোয়ারের রুপ নিতে শুরু করলো! অতিশেরভালোবাসা ভয়ঙ্কর রকমের বিকৃত যৌন অত্যাচারে পরিণত হল। স্ত্রীর ইচ্ছে থাকুক বা না থাকুক,শরীর ভাল আছে কি না আছে, কোন কিছুকেই আমল না দিয়ে যখন তখন জোর-জবরদস্তিচলতো। বিভিন্ন ধরনের বিকৃত উত্তেজক ছবি দেখা আর স্ত্রীর ওপর তা প্রয়োগ করাটা এক নেশায়পরিণত হল! অতিশের বিকৃত ইচ্ছের বিরুদ্ধে কোনরকম আপত্তি করলেই ভয়ঙ্কর ক্রুদ্ধ হয়ে উঠতো।একে তো স্বেচ্ছায় বাবার বাড়ি ছেড়ে এসেছে অতিশের কাছে, তায় আবার লেখাপড়া ও উচ্চমাধ্যমিকে ইতি টেনেছে। কি যে করবে পারমিতা বুঝে উঠত না!  ভোর হলেই অতিশ ভালমানুষ হয়ে যায়! তখন পারমিতা কান্নাকাটি করে, বোঝায় অতিশকে, কিন্তু কোন পরিবর্তন নেই!রাত হলে আবার সেই হিংস্র জানোয়ারের রূপ নেয়।

বাবাকে তো আর এসব কথা বলা যায় না! তবুও একদিন আভাষে ইঙ্গিতে মানসিক অশান্তির কথা জানালে বাবা বলেছিলেন “একদম যদি মানিয়ে নিতে না পারিসতবে চলে আয় না আমার কাছে । পড়াশুনাটা আবার শুরু কর,আমি বেঁচে থাকতেই দেখ যদি নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারিস”। কিন্তু চলে আসতে পারে নি পারমিতা।বাবার কাছে পাকাপাকি ভাবে ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিতেই আচমকা একদিন স্ট্রোক হয়ে বাবা পৃথিবী ছেড়ে চলে যান!উচ্চমাধ্যমিক পাশ পারমিতার তিন কূলে আর আপন বলতে কেউ রইল না। অগত্যা বাধ্য হয়েই স্বামীর ঘরে মুখ গুঁজে থাকা। কিন্তু পারমিতা অতিশকে ত্যাগ করে বাবার বাড়ি ফিরে যাওয়ারসিদ্ধান্ত নিয়েছিল, এই কারণে অতিশ দিনে দিনে অতিশয় ক্রুদ্ধ হয়ে পারমিতার ওপর বিকৃত অত্যাচারের মাত্রা আরও বাড়িয়ে দেয়!

মুখচোরা অন্তর্মুখী চরিত্রের পারমিতা কাকে বলবে এসব কথা?মাঝে মাঝে ভাবতো, ঘর ছেড়ে বেরিয়ে যাবে! কিন্তু কোথায়, কার কাছে যাবে? কাকেই বা বলবে এসব কথা? যদি অতিশের কানে ওঠে তবে হয় অত্যাচার করে মেরে ফেলবে, নয় বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দেবে! তখন কি করবে সে? তবুও একদিন সাহস সঞ্চয় করে তার চেয়ে প্রায় দ্বিগুণ বয়সীবড় ননদকে অতিশের বিকৃত যৌন অত্যাচারের কথা জানায়। শুনে বড় ননদ অবাক হয়ে বলেছিল,
 “আমার হীরের টুকরো ভাইয়ের সম্পর্কে এসব কি বলছ তুমি? ওকত ভাল ছেলে তা তুমি জানো? ছেলেদের একটু আধটু অমন শারীরিক চাহিদা থাকে! স্ত্রীদের কর্তব্য তা পূরণ করা! তোমার জামাইবাবুরও আছে! আমি নিঃশব্দে তা পূরণ করি। আমি কি ঘরেরবাইরে সে সব কথা পাঁচ কান করতে গেছি? শুনেছো কোনোদিন? আর তুমি কিনা এসেছো তোমাদের চার দেওয়ালের ভেতরের কথা আমাকে জানাতে? ভাইয়ের কথামত চললেই তো পারো!কি গুণ আছে তোমার শুনি? ওই তো একটু রূপ! তাও তো আমার ভাই বউঅন্তঃপ্রাণ! অন্যমহিলার দিকে চোখ তুলেও চায় না! ভাই যদি তোমাকে ছেড়ে অন্য মেয়ের কাছে রাত কাটাতো তোমার ভাল লাগতো?”

পারমিতা ভয়ে আর কথা বাড়ায় না! যদি অতিশের কানে ওঠে!নইলে ননদের কাছে খুব জানতে ইচ্ছে করছিল, “সঙ্গমের সময় জামাইবাবুও কি বড়দির স্তন দুটোশক্ত দড়ি দিয়ে বেঁধে রাখে? সিরিঞ্জ দিয়ে গরম জল জোর করে যৌনাঙ্গে প্রবেশ করায়? শরীরের গোপন জায়গায় সিগারেটের ছ্যাঁকা দেয়? স্ত্রীর মুখে রেতঃপাত করে? বাবার মৃত্যুর পর চারদিনের কালাশৌচের মধ্যেও একজন পিতৃহারা কন্যাকে শোক করার সময়টুকু দেয় না যে স্বামী, তাঁকে কিভাবে মানুষ বলবে পারমিতা? চোখের জল মুছে ফিরে এসেছিল ননদের বাড়ি থেকে। তাই আজখুব মনে পড়ছে বাবার কথা! বাবার ইচ্ছেমত যদি লেখাপড়া মন দিয়ে করতো, তবে এদিন আজদেখতে হত না!

তাও যদি একটা সন্তান হত ওদের, তাহলে হয়তো কিছুটা পাল্টাতো অতিশ! কিন্তু ভগবানের কি যে মহিমা কে জানে! আট বছর হল বিয়ে হয়েছে, একটি সন্তানও আসেনি পারমিতার গর্ভে। অথচ দিন দিন অতিশের অত্যাচার বেড়েছে। আজকাল বাইরেরকারো সাথে সেভাবে মিশতে দেয় না। অফিস যাওয়ার সময় পারমিতাকে ঘরে তালা বন্ধ করে যায়।পারমিতাও ভয়ে কাউকে কিছু বলে না। স্বল্প শিক্ষিতা পারমিতা মহিলা কমিশনের নাম শোনেনি কখনো!

আজ সন্ধ্যেবেলা, হ্যাঁ, যে অতিশ বাইরের কারো সাথে পারমিতাকে মিশতে দেয় না, সে অতিশ সন্ধ্যেবেলা সাথে করে একজন অপরিচিতকে নিয়েএসেছিল। লোকটার চোখ দুটো যেন কেমন! বাইরে থেকে অনেক রকম খাবার কিনে এনেছিলঅতিশ। সেসব খাবার পারমিতাকে পরিবেশন করতে বলে। পারমিতা খাবার পরিবেশন করে দিয়েবেডরুমে চলে আসে। কিছুক্ষণ পর অতিশ এসে পারমিতাকে ড্রইং রুমে যেতে নির্দেশ দেয়। আরসঙ্গে এও বলে, “ইনি নাকি অফিসের বস। এনাকে একটু খুশি করতে হবে। বেশি কিছু না, একটুহেসে কথা বলা, অথবা উনি হাত টাত ধরলেও ধরতে পারেন। যদি শুতে চায়, পারমিতা যেন হেসেরাজি হয়! তাহলেই নাকি নতুন ফ্ল্যাটের জন্য অফিস থেকে অতিশ একটা বড় মাপের লো পাবে”।

অতিশের কথাটা শুনে পারমিতা স্তম্ভিত হয়ে গিয়েছিল! দিনের পর দিন নিজে শারীরিক মানসিক অত্যাচার করেও ক্ষান্ত হয় নি! আজ আবার বাইরের লোকের কাছে নিজের স্ত্রীকে পাঠাতে চাইছে!! আজ এই লোকটিকে মেনে নিলে কাল আবার যে অন্যকাউকে বাড়ি আনবে না তার কোন গ্যারান্টি নেই! আর তাই এই প্রথম আজ তীব্র প্রতিবাদকরেছিল পারমিতা! কিন্তু সে প্রতিবাদের মাসুল দিতে হয়েছিল চরম ভাবে। অপরিচিত সেই লোকটা অধস্তন কর্মচারীর সুন্দরী বৌকে হাতে না পেয়ে বিরক্ত হয়ে অতিশকে গালাগাল দিয়ে চলেগিয়েছিল। আর তারপর ঘরের দরজা জানালা বন্ধ করে, অবাধ্য স্ত্রীর মুখ বেঁধে, বেল্ট দিয়ে নিষ্ঠুরভাবে মেরেছিল অতিশ। সারা শরীরে চাকা চাকা কালশিটে করে দিয়েছে! তারপর নিজে ক্লান্ত হয়ে হাঁপাতে শুরু করে। প্রবল শ্বাসের সমস্যা শুরু হয় অতিশের!

কিছুদিন ধরেই অতিশ শ্বাসকষ্টের সমস্যায় ভুগছে। সকালসন্ধ্যায় নিয়ম করে ইনহেলার নিতে হচ্ছে। আজ সন্ধ্যের ইনহেলার সময় মত নেওয়া হয়ে ওঠেনি।অতিশ হাঁপাতে হাঁপাতে বিছানায় বসে পড়ে। টেনে টেনে শ্বাস নিতে নিতে পারমিতাকে আদেশ করেইনহেলারটা পাশের ঘর থেকে এনে দেওয়ার জন্য। পারমিতা যন্ত্রণায় কুঁকড়ে যাওয়া শরীরটাকেকোনোরকমে টেনে নিয়ে গিয়েছিল পাশের ঘরে, যেখানে টেবিলের ওপর অন্যান্য প্রয়োজনীয় জিনিসের সাথে ইনহেলার রাখা ছিল। কিন্তু হঠাৎ কি যে বুদ্ধি হল পারমিতার! প্রচণ্ড আক্রোশে অতীশকে একটু শাস্তি দিতে চট করে ইনহেলারটা লুকিয়ে ফেলল। আর পুরনো খালি একটা ইনহেলার এনে এগিয়ে দিল অতীশের দিকে। অতীশ কোন প্রশ্ন না করেই সেটা নিয়ে প্রাণপণে পাফ নিতে লাগল। কিন্তু ফাঁকা ইনহেলারে কিছুই হল না। শ্বাসকষ্ট বেড়েই চলল। চোখ ঠেলে বেরিয়ে আসতে লাগল! মুখের শিরা উপশিরা ফুলে উঠলো অতিশের!

এখন বিছানায় শান্ত হয়ে ঘুমিয়ে আছে অতিশ। ভোরের আলো এসে সারা ঘরে ছড়িয়ে পড়েছে পূবের খোলা জানালা দিয়ে। অনেক দিন বাদে আজ এই ভোরেরআলোটা খুব সুন্দর আর মিষ্টি লাগছে! পারমিতা জানালার কাছ থেকে সরে এলো। বিছানার একপাশ থেকে অতিশের মোবাইলটা তুলে নিল। একটা নম্বর ডায়াল করে বলল, “হ্যালো, কালিপুকুর থানা? আমি ৬৪/বি কালিচরণ লেন থেকে বলছি। এখুনি চলে আসুন। কাল রাতে এখানে একটা খুনহয়েছে। হ্যাঁ, হ্যাঁ, খুনই হয়েছে! আমি ওনার বাড়ি থেকেই বলছি। আমি কে? মৃতর স্ত্রী পারমিতা বলছি!”


গুপ্তধন

সন্ধ্যা ছুঁইছুঁই, যদিও দুপুর থেকেই আকাশ কালো করে আছে, সময় বোঝা যাচ্ছিল না। দুপুর থেকে আমি আমার প্রিয় জানলার সামনে বসে, ছোটবেলা থেকেই এখানে বসতে খুব ভালো লাগে। একতলার কার্নিশে একটা বটচারা জন্ম নিয়ে বাড়তে বাড়তে আমার জানলার সামনে বেশ মাথা চারা দিয়ে উঠেছে। আমি জানলার সামনে আসলেই সে মাথা দুলিয়ে দুলিয়ে কত কথা বলে, আমিও বলি। নিঃসঙ্গতা আমাদের কত আপন করে দিয়েছে। আমরা আজ খুব ভালো বন্ধু , আর হবো নাইবা কেন ? চারাগাছটা কোনদিন মাটি ছোঁয়নি আর আমার পায়ের তলায় মাটি নেই, ওর শিকড় নোনাধরা দেওয়ালে উন্মুক্ত আর আমার শিকড় কোন যুগেই ছিঁড়ে গেছে। তফাৎ ও আছে, চারাগাছটা শিকড় দিয়ে দেওয়ালের পলেস্তারা আঁকড়ে ধরে বাঁচার লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে আর আমার বাঁচার ইচ্ছারা আমার চারপাশে শীতের পাতার মত খসে যাচ্ছে । কিছুক্ষণ আগে আমার জানলায় লেপ্টে থাকা চৌকো আকাশ অদ্ভুত শিষ দিতে দিতে বেশ কিছু যাযাবর পাখি পার করে গেলো। বুঝলাম এবার সন্ধ্যা নামবে । ছোটবেলা থেকেই পাখি গুলি দেখলেও তাদের পরিচয় জানতে পারিনি। শুনেছি যাযাবর যারা হয় তাদের নাকি কোনও শিকড় থাকে না, কিন্তু আমি ভেবে অবাক হয়ে যাই এই ছোট্ট পাখিরা ঠিক চিনে কেমন তার আগের ঠিকানায় পৌঁছে যায় , আর আমি সমস্ত শিকড় ছিঁড়েও এই ন্যুব্জ দশ বাই দশে কেমন স্বেচ্ছায়  বন্দী হয়ে আছি।
সময় দেখার জন্যে বা কব্জির দিকে অভ্যাস বশে তাকালাম , হাতঘড়িটা পরশু থেকে আর সময় দেখাচ্ছে না। বন্ধ হয়ে গিয়েছিল , দোকান থেকে বলল দেড়শ টাকা লাগবে সারাতে , শেষ পর্যন্ত পঞ্চাশে ওটা দোকানেই বেচে দিয়েছি ।দেওয়াল ঘড়ির খোলটা ঝুললেও ওটা কবে দেহ রেখেছে সে হিসেব আর মনে নেই। ।শুধু হাওয়া পেলে পেন্ডুলামটা দুদিকেই কেমন যেন ইতিবাচক মাথা দোলায়। প্রথম চাকরির প্রথম মাইনে দিয়ে কিনে বগলদাবা করে বাড়ী ফিরেছিলাম। তখনও মা বেঁচে, মা সেদিন ঘড়ি দেখে খুব খুশী হয়েছিলেন , বলেছিলেন - এবার ভাল করে সময় দেখা যাবে। আর আমি ভেবেছিলাম যদি সময়টা এবার একটু ভালো হয়।  আজ আর সময় কত হলো জানার উপায় নেই। বাইরে শব্দ করে নামল তুমুল বৃষ্টি । এবার ঘরটা পুরো অন্ধকার হয়ে গেলো। অন্ধকার ঘরে নিজেকে ভূতের মত লাগে, সেটাই এখন অভ্যাস করে নিয়েছি। খুব প্রয়োজন না থাকলে যতই অন্ধকার হোক আলো জ্বালি না। এ বাড়িতে ইলেকট্রিকের লাইন এক যুগ আগেই কেটে দিয়েছে । সারা ঘর অনেক হাতড়ে খুঁজে পেলাম মোমবাতির অবশিষ্ট ইঞ্চি দুয়েক , তাই ধরালাম।

চৌকির তলা থেকে পুরনো টিনের বাক্স টেনে বার করলাম । বাক্সটার জায়গায় জায়গায় মরচে ধরেছে, টানতে গিয়ে এক সাইডের কড়া খুলে হাতে চলে এলো। অনেক করে ঘরের মাঝামাঝি রেখে, বাক্সটা খুলে ফেললাম । এক দমকায় দীর্ঘদিন না খোলা অদ্ভুত সোঁদা গন্ধ সারা ঘরময় ছড়িয়ে পড়ল। মায়ের দুতিনটে পুরনো শাড়ি, আমার ছেলেবেলার কয়েকটা পোশাক সমেত অনেক স্মৃতি মেলে ধরল জং পড়া বাক্সটা। আমি যেন স্মৃতির সরণী বেয়ে অনেক  দুর চলে গেলাম। এই চৌকির তলা ছিলো যে কোন দুষ্টুমির পর আমার লুকোনোর জায়গা, মায়ের উপর অভিমান করলেও এখানেই জায়গা করে নিতাম, তারপর মা অনেক আদর করে যখন ডাকতেন, একছুটে মায়ের কোলে ঝাঁপিয়ে পড়তাম । হাতে ঠেকল একটা লাটাই, বের করে আনতেই মনে হলো কলকাট্টি ছেঁড়া কত ঘুড়ি কত কায়দা করে উড়িয়েছি আর নিজের কলকাট্টি ভাঙা জীবনটা আজ হাওয়ায় উড়ে যাবে। মোমবাতির শিখাটা হাওয়ায় ফড়ফড় করে উঠতেই সম্বিত ফিরে পেলাম। মোমবাতি শেষ হতে আর বেশী দেরী নেই। বাক্সের জিনিসপত্র টেনে বার করলাম, পুরনো স্মৃতি নাহয় বাড়ীর সাথেই মিশে থাকবে। আমার কয়েকটা পোশাক আর গুটিকতক বই ভরলাম, হাতের কাছে সামান্য যা জিনিসপত্র আছে গুছিয়ে নিলাম ।

বাড়িটা কাল সকালের মধ্যে ছাড়তে হবে। দেশভাগের পর ওপার থেকে এসে এই বাড়ি ভাড়া নিয়েছিলেন আমার ঠাকুরদা। বাবা-মায়ের বিয়ে , আমার জন্মও এ বাড়িতে।  অবশ্য বাবার ছেলেবেলাও এখানে কেটেছে । আমার ঠাকুরদা ঠাকুমাকে মনে নেই। বাবা একদিন অফিস থেকে ফেরার সময় নিখোঁজ হয়ে যান। অনেক খোঁজার পরেও আর পাওয়া যায়নি। তখন আমার আট বছর। তখন থেকেই দুঃখ কষ্ট একসাথে সংসার বেঁধেছে এই ঘরে। সতেরোতেই পাটকলে চাকরি। আর তিন বছর যেতে না যেতেই কুড়ি বছর বয়সেই আমি একা হয়ে গেছি , মা চলে গেলেন। পরের দিনটা ছিলো বাবার নিখোঁজ হবার বারো বছর পূর্ণ হবার। নিয়ম মত বাবাকে মৃত মেনে মায়ের বিধবা হওয়ার  দিন, মা সধবা থেকেই চলে গেলেন। তারপর আরও পঁয়ত্রিশ বছর কেটে গেছে। গঙ্গার পাড়ে যে পাটকলে কাজ করতাম, সেটা বছর দশেক আগে বন্ধ হয়ে যাবার পর থেকে প্রায় ঘরবন্দী। যেটুকু টাকাপয়সা পেয়েছিলাম তা প্রায় শেষ। বাঁচার কোনও ইচ্ছে আর বেঁচে নেই। কোনরকমে দিন কাটে।

বাড়িটা ঝুরঝুর করে ভেঙে পড়ছে, সরকার থেকে বিপদজনক ঘোষনা করেছে বছর ছয়েক আগেই।  দুতিন দিন আগে বাড়ির দোতলার ডান দিকের কিছুটা  অংশ হঠাৎ ভেঙে পড়েছে।তাই বড় বিপদ থেকে বাঁচতে বাড়িটা কাল সকালেই ভেঙে গুঁড়িয়ে দেওয়া হবে। বাড়িটা এককালে গমগম করত, কত ভাড়াটে, কত লোকজন । এখন সবাই চলে গেছে। রয়ে গেছি আমি আর বগলা। আমি থাকি দোতলায় আর বগলা একতলায়। একতলার ওই ঘরটায় আগে  দাসবাবুরা থাকতেন , একদিন ছাদ থেকে একটা বড় চাঙর ভেঙে পড়তেই ওনারা বাড়ি ছাড়লেন, আর বগলা বিনে পয়সায় থাকতে চলে এলো। সেও প্রায় বছর পাঁচেক হলো।

মাঝে মাঝে বগলার সাথে কথা হয়। ও কোনকিছু লুকায়নি। বগলার জন্ম উত্তর কলকাতার পুরনো এক রেডলাইট এলাকায় । মায়ের আদরে বড় হলেও  স্বভাবতই বাবার নাম  পরিচয় তার অজানা । বারো পেরোতেই জোর করেই তাকে পেশায় নামানো হয় ।  কত স্বপ্ন সে দুচোখে বেঁধেছিল সব হারিয়ে যায়। একটা সংসার , স্বামীর স্বপ্ন দেখেছিল । জানত এ জীবনে হওয়ার নয় তবুও , যদি কোন স্বপ্নপুরুষ এসে  স্বপ্ন পুরন করে যায়। না, স্বাভাবিক ভাবেই  কেউ আসেনি । ধীরে ধীরে বগলা সেই জীবনেই অভ্যস্ত হয়ে যায়। কত পুরুষ তার বুকে মাথা রেখে কেঁদেছে হেসেছে তার হিসেব নেই। একটা কথা বারবার বগলা তার বিশ্বাস থেকেই  বলে - সমাজের উপর থেকে নিচ যারাই তার ঘরে গেছে, মনে করত পয়সার বিনিময়ে তাকে কিনে নিয়েছে, তাদের সবার এক খিদে এক চাহিদা , নখের আঁচড়েরও এক জ্বালা।  সব এক সেখানে , কোনও পার্থক্য নেই। বগলার একটা গর্ব আছে, সে তার মায়ের মতো ভুল করেনি, তার শরীরে আরেকটা প্রাণ বেড়ে ওঠার প্রশয় কখনই দেয়নি।   তারপর চলতে চলতে  বগলার শরীরটা ছিবড়ে হতে থাকে, সময়ের আগেই বুড়িয়ে যেতে থাকে, চড়া মেক-আপেও আর  বুড়িয়ে যাওয়া লুকিয়ে রাখা যাচ্ছিল না। শেষ পর্যন্ত চল্লিশ ছুঁতেই বাতিলের খাতায়। নিজেকে বড় অসহায় মনে হতো, পরিত্যক্ত মনে হতো । ঘরটাও অন্যের দখলে চলে গেলে একদিন রাতে বেরিয়ে পড়ে। অনেক জল গড়িয়ে এখন এ বাড়িতে থাকে, সামনের ফুটপাতের হোটেলে রান্নার কাজ করে। এখন বেশ নিজেকে গুছিয়ে নিয়েছে। আমাকে মাঝে মধ্যেই হোটেলের বাড়তি সব্জি দেয়। বুঝি জীবন জুড়ে একটা বোবা কষ্ট বুকের তলায় বয়ে বেড়ায়। একদিন বলেছিল - দাদাবাবু আর বাঁচতে ইচ্ছে করে না , দেখো একদিন ঠিক রেললাইনে মাথা দেবো, নয়ত গঙ্গায় ঝাঁপ দেবো।

মোমবাতিটা শেষ। কিছুটা দপদপ করে নিভে  গেলো। অন্ধকারে ভূতের মত বসে থাকলাম কিছুক্ষণ । বাইরে পুরো সন্ধ্যা নেমে গেছে। জানলার ভাঙা খড়খড়ি দিয়ে লালচে নিওন আলো আসছে ঘরে। হাওয়ায় গাছের ছায়া আর লাল আলো যেন খেলা করছে ঘরের কোনে। লুকোচুরি খেলা, আমি কখনও লুকোতে পারিনি, শুধুই খুঁজে গেছি, ধাপ্পা খেয়ে আবারও খুঁজেছি। এখন খোঁজাও বন্ধ করে দিয়েছি । ঘরে বসে আলোছায়ার খেলা দেখি। এর আগে খালি পেটে কতরাত এই দেখেই কাটিয়ে দিয়েছি । আজই শেষ, কেমন অস্বস্তি লাগছে। উঠে পড়লাম, দরজা খুলে বাইরে এলাম। মাঝখানে সিঁড়ি এপাশে চারটে ঘর , ওপাশে চারটে ।সামনে লম্বা বারান্দা ।  ওপাশের ঘর গুলো ভেঙে পড়েছে। বারান্দায় এসে দাঁড়ালাম। 
- ভোকাট্টা ভোকাট্টা

চোখের সামনে ভেসে উঠল একপাল ছেলে, ঘুড়ির লড়াইয়ে ব্যস্ত , ওই তো আমি আছি। ছোটবেলায় লম্বা বারান্দায় পরপর দাঁড়িয়ে কত ঘুড়ি উড়িয়েছি। মনে হল সত্যিই আমি আছি? আচ্ছা এই থাকাটার কি কোনও মানে আছে? জানিনা , হয়ত নেই হতে পারিনি বলেই আছি। বৃষ্টিটা থেমেছে, এখনও
  আকাশ কালো , যখনতখন আবার নামবে। চারপাশে তাকালাম কেউ নেই, যেন একটা ধ্বংসস্তুপের মধ্যে দাঁড়িয়ে আছি। পুরো বাড়িটা যেন ভাঙাকেল্লা, আর আমি তার অশরীরী রক্ষক । ঘরের দিকে গেলাম।
- বলহরি হরিবোল 
ঠিক এখানটাতেই , দরজার পাশে বারান্দায় মায়ের নিথর দেহটা শেষবারের মত শোয়ানো ছিলো। বসে পড়লাম, মাকে ছোঁয়ার আপ্রাণ চেষ্টা করতে লাগলাম। না, ব্যর্থ চেষ্টা। বিশ্বাস করো মা তোমার
  কাছে যেতে চাই। উঠে দাঁড়ালাম, ভেবেছিলাম এই বাড়ি থেকেই আমার মৃতদেহ একদিন বেড়োবে, হলো না, আজই আমার  জীবন্তলাশটাকে নিয়ে চলে যাব।

বৃষ্টি হচ্ছে না, ঘরের সোঁদা গন্ধ যেন বুক পেতে ডাকছে। বিছানায় বসতে ইচ্ছে করছে। কিন্তু আর নয় মন খারাপ করে লাভ নেই। এখনই বেরিয়ে পড়ি, গন্তব্য কিছু নেই, যেতে যেতে যেখানে  পৌঁছাই।  হাতে পঞ্চাশ টাকা , তারপর কি হবে জানি না। এটা মানি যে মৃত্যুর ওপারে কিছু নেই।টিনের বাক্সটা নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম, দরজাটা খোলাই থাকল, ঘরটা প্রাণ ভরে শ্বাস নিক, হোক না একটাই রাত। ভাঙা ভাঙা সিঁড়ি বেয়ে হাতড়ে নেমে এলাম। বগলার ঘরে আলো জ্বলছে, ভাবলাম ওকে জানিয়ে যাই।
- বগলা, বগলা 
- কে? দাদাবাবু? আসুন
 
প্রথমবার বগলার ঘরের চৌকাঠ
  পেরিয়ে ঘরে ঢুকলাম। আজ আর কোনও বাছবিচার নেই। ওর দেওয়া খাবার খেলেও এতদিন ওর ঘরে ঢুকতে কেমন একটা অস্বস্তি হতো।  দেখি ভাত উপুড় দিচ্ছে ।
- বগলা আমি চলে যাচ্ছি
- কোথায় যাবেন?
 
- জানি না,যেতে হবে তাই চলে যাচ্ছি , তুমি কি করবে?
- জানি না , আমার তো কোথাও যাবার ইচ্ছে করে না।
 
এমন সময় দুর দিয়ে একটা রেলগাড়ী চলে গেল । হয়ত মেল ট্রেন । কিছু কি ইঙ্গিত দিয়ে গেল গাড়ীটা ? রেলগাড়ীর আওয়াজ কমতেই অন্যমনস্ক হয়ে বগলা বলল - হয়ত আজ রাতেই
 
  
দমকা হাওয়ার ঘরের কুপিটা নিভে গেলো, যেন আমাদের অন্ধকার জীবনটাকে আবার মনে করিয়ে দিল।
  অপেক্ষা আর ভালো লাগছে না , আমি অন্ধকারেই বললাম - যাই 
- একটু দাঁড়ান , আলোটা জ্বালি
বগলা স্যাঁতস্যাঁতে দেশলাই কাঠি দিয়ে বাতি জ্বালানোর চেষ্টা করতে থাকে , আমি চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকি। বাতিটা জ্বলার সাথে সাথেই বাইরে একটা ছোট বাচ্চার কান্না ভেসে আসে। শব্দটা খুব কাছেই, ভেতরটা মুচড়ে উঠল। বাক্সটা ফেলে ছুটে যাই, বুঝতে পারলাম কান্নার শব্দটা সিঁড়ির নিচ থেকে আসছে।  সিঁড়ির তলায় আশেপাশের দোকানের পুরনো বাক্স আর ড্যামেজ মালে ভর্তি । বগলা আলো নিয়ে এলে একটু উঁকি দিতেই দেখতে পেলাম একটা ভাঁজ করা পিচবোর্ডের বাক্সের উপরে  কাপড়ে জড়ানো একটা সদ্যজাত শিশু, কেউ ফেলে গেছে। চারদিকে তাকিয়ে দেখি কেউ নেই, বাইরে গিয়েও কাউকেই খুঁজে পেলাম না।   কয়েকজনকে প্রশ্ন করে কোনও উত্তর পেলাম না। ফিরে এসে দেখি বগলা বাচ্চাটাকে কোলে নিয়ে বসে আছে, বাচ্চাটাও কেমন চুপ করে গেছে। বগলা বাচ্চার মুখে স্নেহের চুমু দিচ্ছে বারংবার। আমি এ দৃশ্য উপভোগ করতে লাগলাম।
-
  বগলা ?
- বাচ্চাটাকে বাঁচাতে হবে, দাদাবাবু , আমি বাচ্চাটাকে মানুষ করতে পারব না ?
বগলার চোখে আবার বাঁচার আশা চিকচিক করছে, সেটার ছোঁয়া যেন আমিও পেলাম। নতুন করে বাঁচার ইচ্ছেটা বহু বছর পর জেগে উঠল।
- পারব বগলা, আমরা ওকে সত্যিই মানুষ করতে পারব।


About