এই সংখ্যার লেখকসূচি - সাঈদা মিমি। সুবীর কুমার রায়, নীহার চক্রবর্তী, উত্তম বিশ্বাস, নিবেদিতা ঘোষ মার্জিত, মনোজিৎ কুমার দাস, শ্রী সেনগুপ্ত ।

              সূচিপত্রে লেখকের নামে ক্লিক করুন
মহাপ্রস্থানগড় ও যন্ত্রদানব

 
মমিনা দেখতে চায় না। তারমানে এই নয় যে সে উপেক্ষা করছে। না চাইলেও চোখে পড়ে। কারওয়ান বাজারের যে দিকটায় একটি পাঁচতারা হোটেল আছে তার উল্টোদিকের আবছায়া গলি থেকে মেয়েটাকে ভাড়া করলো তিন চারজন। এখানে জোরাজুরির কিছু নেই, দুইপক্ষই সম্মত। তারপর ওরা একটা সিএনজি নিয়ে চলে গেল। মমিনার তখন ব্যস্ততা অন্য জায়গায়। জোবেদ আলির কাছে যাওয়ার তাড়া, মতামত দরকার। সংবাদটা দেয়ার পর থেকেই থমকে আছে জোবেদ আলি। মমিনার চোখের সামনে কিছু দৃশ্য ভেসে ওঠে। একটা ঘর, রঙচঙে ময়লা চাদর, ঘোলাটে বাথরুমে বহুব্যবহৃত তোয়ালে, একটা পানির বোতল, দুইটা গ্লাস এইসব। সে অবাক হয়, এখন এইসব ভাবনা আসবে কেন! তখনই ফোনটা আসে। জোবেদ আলি বলছে, ফেলে দাও। আমার সংসার আছে, তোমারও.... কি যে বিস্ফোরণ হয় মাথায়! রেলক্রসিংয়ে একটানা টিং টিং টিং টিং শব্দ, লোকাল ট্রেন আসছে...
পরিচালক বলে উঠলো, কাট। নিলীমা ক্ষিপ্ত হয়, ডামির ছিটকে পড়ার দৃশ্য নেবে না? মাজহার ভেটো দিল, এইসব দৃশ্য পুরনো হয়ে গেছে। ছিটকে পড়া রক্ত দেখাব, ভালগারিজম আনা যাবে না। দর্শককে বোঝাতে রক্তের ছাপই যথেষ্ট। নিলীমা বিরক্ত হতে থাকে। বোঝা যায়, এই বিরক্তিটা তার নিজের ওপর নিজেরই। মমিনাকে মরতে হবে কেন? সেন্টিমেন্টাল রাবিশ। কেউ প্রেমিকের মাধ্যমে গর্ভবতী হলেই মরবে? ট্রেন তার পথে যাক, মমিনা মমিনার। মাজহারকে একটু বিচলিত মনে হয়, কিন্তু আপনিই তো এরকম বলেছিলেন! এখন পাল্টাতে বলছি। এরকম আজাইরা মুভি আমি বানাবো বলে লগ্নি করিনি! মাজহার খানিকটা চিন্তিত ভঙ্গিতে বসে থাকে। কাহিনি বদলাতে হবে, অনেকগুলি সিকোয়েন্স। প্রায় পঞ্চাশ ভাগ শ্যূটিং হয়ে গেছে ইতিমধ্যে। বাজেট ফেইল করবে!
সে পঞ্চপাণ্ডবের সহচর হয়েছে। যোশিমঠ থেকে বদ্রীনাথ, তারপর মানাগ্রাম। শুরুটা হয়েছিল গাড়োয়ান থেকে। সেই গাড়োয়ান, যাকে ঘিরে আছে গঙ্গা, যমুনা, সরস্বতী, মন্দাকিনী, অলকানন্দা; মর্ত্যভূমির স্বর্গ। পশ্চিমে হিমালয়ের ইশারা। হরিদ্বার পার হয়ে যোশিমঠ, দীর্ঘ হাঁটাপথ। তার সময়জ্ঞান ছিল না। দিন, মাস কিংবা বছর। অন্ধকার আর আলো বুঝতো। কখনও কখনও খিদে, তৃষ্ণা। কোথায় যোশিমঠ? স্বর্গারোহনের পথ? দেবপ্রয়াগ, রুদ্রপ্রয়াগ, কর্ণপ্রয়াগ, নন্দপ্রয়াগ পার হওয়ার পর এক সুতন্বী বাতাস এসে বললো, আর বেশি দূরের পথ নয়....পঞ্চপাণ্ডব এখনও শিবিকায় অবস্থান করছেন, তাদের পত্নী সুন্দরী গৌরি মানসিকভাবে বিধ্বস্ত থাকায় এখনও শয্যা ছেড়ে উঠতে সক্ষম হননি।দেবপ্রয়াগে সে অলকানন্দা, ভাগিরথী আর গঙ্গার ত্রিধারায় ডুবতে বসেছিল। না..., দেহত্যাগ করে নয়... বলতে বলতে তার অন্তরে দেবদত্ত এক শক্তি ভর করেছিল। আমিও সশরীরে স্বর্গে যেতে চাই। তারপর, ত্রিবেণীর ঘূর্ণি তাকে ছুঁড়ে ফেলে দেয়। মন্দাকিনীর পর দুটো পথ। একটা কেদারনাথের দিকে গেছে, আরেকটি বদ্রিনাথ। সে বদ্রিনাথ যাবে কিন্তু এখন একটু বিশ্রাম দরকার। ফুলে ওঠা ক্ষতবিক্ষত পা দুটো টেনে সে যোশিমঠের এক ধর্মশালায় দাঁড় করালো নিজেকে। এখন অন্ধকারের শৈশব। হঠাৎ অনেক দিন, মাস বা বছর পরে সে প্রচণ্ড খিদে ও পিপাসা অনুভব করলো।
ট্রেন অসবে কিন্তু মমিনা আত্মহত্যা করবে না। কারণ, সে জোবেদ আলিকে ভালোবাসে! হতে পারে, জোবেদ আলি এই বাচ্চাকে স্বীকৃতি দিতে পারেনি... তবুও। আহা, জোবেদ আলির কি দোষ? তার তো স্ত্রী সন্তান আছে! কিংবা মমিনার কথাই ধরা যাক, সেও তো বিবাহিতা! তারও সন্তান আছে। এই অবস্থায় আত্মহত্যা করা যায় কি? ঘোর অন্যায়, সন্তানদের প্রতি অন্যায়। মমিনা এবং জোবেদ আলি তো ভুলেই গিয়েছিলো,জীবন কি? তারা রোজ মরে বেঁচে ছিলো। মাঝখানে এই ঝামেলাটা দূর্ঘটনাবশত হয়ে গেছে। মমিনা পারবে না, জোবেদ আলিকে রেখে পালাতে পারবে না সে।এই পর্যন্ত ভাবার পর মাজহার ক্ষান্ত দেয়। এই টিপিক্যাল স্টোরি চলবে কি? এর চেয়ে ভালো হতো যদি সে নাচে গানে ভরপুর একটা মারদাঙ্গা ছবি বানাতো। যদিও মাজহার মূলধারার বাইরে বসে চলচ্চিত্র নির্মাণ করে। তবে আর্ট ফিল্ম নয়। কিছু গান কিংবা মারামারি থাকে। পাবলিক সেটাকে বলে জীবনবাদী ছবি। কিন্তু এই ভূতগ্রস্ত ধনী নারী নিলীমা এরকম ওল্ড ধারার মুভিতে টাকা ঢেলে বসে আছে। ব্যাকগ্রাউণ্ডে লালনগীতি থাকতে পারে। প্রয়োজনে নগ্নতা আসতে পারে। মাজহার নিলীমাকে এই দূর্বল চিত্রনাট্যের কথা বলে তাকে একটু বানিজ্যিক হওয়ার পরামর্শ দেয়। অগ্নিদৃষ্টি হেনে বের হয়ে আসে নিলীমা। এই ধনাঢ্য শতপদী নারীর আচরণ বুঝতে পারে না মাজহার। সঙ্গত কারনেই সে নিজের ওপর ফেটে পড়ে।৪রুধিরা ধর্মশালার নির্জনে পশু চামড়ার কম্বল জড়িয়ে ঘুমিয়ে পড়েছিল। বদ্রীনাথের দূরত্ব তো কম নয়! খুব ভোরে তাকে হাঁটা শুরু করতে হবে, ভোরের আরতি শেষ করেই। পাণ্ডুকেশ্বরে একবার বিশ্রাম নেবে সে, তারপর বিষ্ণুপ্রয়াগে। খিদে পেলে মাধুকরী করবে, গত কয়েকবছর যেরকম করেছে। শীত আসতে ঢের দেরী কিন্তু হিমালয়ের যত কাছে সে আসছে তার অস্থি পাঁজরে কাঁপুনি দিচ্ছে। তবে সেসব নিয়ে সে মোটেই ভাবিত নয়, তার ভাবনাজুড়ে কেবলই চাররাত্রিতে দেখা একটা স্বপ্ন। একবার অন্বেষের কথা মনে পড়েছিল। সেটার কোন তীব্রতা ছিল না; সেই মনে পড়ায়। অন্বেষ কে? কোন গোত্রের? কিছুই জানে না রুধিরা। তবে দুজনের মধ্যে তীব্র সখ্যতা তৈরি হয়েছিল বৈ কি! যে যার পছন্দকেই গুরুত্ব দেয় তাদের গোত্রে। সুতরাং রুধিরা আর অণ্বেষের কোন সমস্যা ছিল না। নৃত্য-ভোগ-গীত-আনন্দ নিয়ে তারা বেশ ছিল। তাদের পুরোহিতের নির্দেশ ছিল, সন্তান জন্ম দাও; গোত্র বাড়াও। বিয়ে নামক একটা বন্ধন নাকি তৈরি হয়েছে! এবং এই সংক্রান্ত আরও ভয়ংকর তথ্য তারা পেলেও বিশ্বাস করেনি।অন্বেষের বীজ অঙ্কুরিত হল না। রুধিরা মা হতে পারলো না এবং অন্বেষ চলে গেল একদিন। এতে কিছু যায় আসে না তাদের। দেহ আর যৌবন থাকলে আরও অনেকেই আসবে তাকে অঙ্কুরিত করতে। সেই রাতেই বিশাল এক স্বর্ণপুরুষকে স্বপ্ন দেখলো রুধিরা, তার রূপ, প্রভা, ব্যাক্তিত্ব্যে ছিল হীরের ধার। রুধিরা কে পথনির্দেশ দেয়া হয়েছে। বদ্রীনাথে যেতে হবে তাকে, সেখান থেকে হিমালয়। শুরুতে এড়িয়ে গিয়েছিল রুধিরা কিন্তু পরপর চার রাত একই স্বপ্ন দেখার পর পুরোহিতের কাছে যায় সে। তিনি চিন্তিত ছিলেন কিছুক্ষণ, তারপর রুধিরাকে বের হয়ে পড়ার নির্দেশ দেন। সেই থেকে শুরু। বিশ্বকর্মার মন্দিরে পৌঁছুনো পর্যন্ত স্বস্তি নেই।রুধিরা ভাবে, বিশ্বকর্মার মন্দিরে পূজো দেয়ার আগে সে স্নান করবে তপ্তকুণ্ডে। এর পরপরই স্নান করতে হবে নারদকুণ্ড ও সূর্যকুণ্ডের উষ্ণ প্রস্রবনে; সেটাই নাকি রীতি! স্বপ্নে দেবনর সেরকমই বলে দিয়েছেন। তারপর তুলসি পাতা দিয়ে স্নান করতে হবে বদ্রীনারায়নে। বিক্ষিপ্ত সব ভাবনা শেষে ঘুমিয়ে পড়েছিল সে। তীব্র শ্বাসকষ্ট নিয়ে ঘুম ভাঙলো তার। কেউ তার ওপর পাহাড়ি দানবের মতন মন্থনলীলা চালাচ্ছে। রুধিরার কষ্ট হচেছ। এই আনন্দকর্মে জোর করে যন্ত্রণা দেয়ার প্রয়োজন কি! তাকে বললেই তো হতো! সে সম্ভবত উহ জাতীয় একটা শব্দ করেছিল, অন্ধকারে কেউ তার মুখ চেপে ধরলো। দূর্বল শরীরে প্রতিরোধের একটা ভাষা তৈরি হয়েছিল রুধিরার, কয়েকটি হাত তার কণ্ঠনালীর দিকে এগিয়ে এলো। রুধিরা জানতেও পারলো না, কি অপরাধে তাকে মরতে হচ্ছে! দেহ থেকে বিযুক্ত একটা আত্মা ছুটছে। পার্থিব কাজ অসমাপ্ত রেখে যাওয়া যায় না, অবশিষ্ট রজনীর মধ্যে তাকে একটা দেহ পেতে হবে।
নিলীমা অপরাধবোধে আক্রান্ত। প্রবল, অসীম, ভয়াবহ এসব বলে এর পরিমান নির্ণয় করা সম্ভব নয়। যে সবে রক্তপিণ্ড হয়ে জমাট বাধছিলো, তাকে নিষ্ঠুরের মত সরিয়ে দেয় সে অথবা সরিয়ে দিতে বাধ্য হয়। জোবেদ আলি কোনভাবেই দায়িত্ব নিতে চাইছিলো না। সেটা কি সম্ভব ছিলো আদৌ? এই মূহুর্তে সংসার ত্যাগ করা কারও পক্ষে সম্ভব ছিল কি? নিলীমার জন্য বিষয়টা ছিল আরও কঠিন। বরং এটা বলাই ভালো, জোবেদ আলি শেষ সম্ভাবনার কথাও ভেবেছিলো। আহা, বাচ্চাটা তবু বাঁচুক! নিলীমা একেবারেই ঝুঁকি নিতে পারেনি। সন্তানের মুখচ্ছবি সবকিছুই বলে দেবে এই আতঙ্ক তাকে রাতের পর রাত ঘুমাতে দেয়নি। তাছাড়া শফিক অতিরিক্ত সন্দেহবাতিকগ্রস্ত। তার একটি ছেলেও রয়েছে এবং সে ইউনিভার্সিটিতে পড়ে। মূলত চৌদ্দ বছর বয়সে দ্বিগুন বয়স ব্যবধানের শফিকের সাথে বিয়ে হওয়ার পর থেকেই অসুখী ছিল নিলীমা। ভেবেছিল এভাবেই মরে মরে বাঁচতে হবে বাকি জীবন। এমন ভাবনার কোন এক এপ্রিলে জোবেদ আলির সাথে তার পরিচয় হয় ভাগ্নির বিয়ের অনুষ্ঠানে।
মাজহার স্বিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছে, উম্মাদ ঘরাণার মহিলা নিলীমার মুভি সে নির্মাণ করবে না। হ্যাঁ, করলে অনেকগুলি টাকা সে পেতো কিন্তু নিজেই উম্মাদ হয়ে যেত। প্রতিটা দৃশ্যে মহিলা ঘাপলা করবে। আকারে ইঙ্গিতে সে বহুবার বোঝাতে চেষ্টা করেছে নিলীমাকে, লাভ হয়নি। মুনাফা ছাড়া ফিল্ম মাজহারও বানায়, পুষিয়ে নেয় পরবর্তী দুটো ছবি দিয়ে। কিন্তু এটা কেমন গল্প? খাপছাড়া চিত্রনাট্য, বেঢপ ইমোশন, সমন্বয়হীনমাজহারের মনে পড়ে, ফিদা হুসেনের গজগামিণীতে কাজ করে মাধুরী কেন বলেছিল সে আর এরকম ছবিতে নেই! সে তো গেল অভিনেত্রীর এক্সপ্রেশন, নির্মাতার তৃপ্তি বলে একটা কথা আছে! মাজহার কাজ করে তৃপ্ত নয়। নিলীমা আইনগত ব্যবস্থা নিলে নিক। সিদ্ধান্তটা নেয়ার পর অনেকদিনের আটকে রাখা দমটা ছাড়ে মাজহার। বয় কে ডেকে খাসির কালাভূনা আর খিচুরির অর্ডার দেয় সে।
দীর্ঘ মহাপ্রয়াণ পথ। সম্মুখে নির্বিকারচিত্তে যুধিষ্ঠির। আসলে, বড় কৌশলে সে নিজের অস্থিরতা গোপন রেখেছে। স্ত্রী দ্রৌপদী বুদ্ধিমতী মহিলা, আরও রয়েছে চারটে অবুঝ ভাই। পরমাশ্চর্য, এখনও সে ভাইদের একরত্তি আর নাদান মনে করে! অবশ্য জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা কর্ণ বেঁচে থাকলে চেপে রাখা কষ্টের বোঝা তাকে বইতে হতো না। দলটা থেমে গেছে। অন্তঃসলিলা সরস্বতীর উৎসস্থলে গভীর খাদ। দ্রৌপদী বলে উঠলো, কিভাবে এগোব প্রভু? যুধিষ্ঠির ভীমের দিকে দৃষ্টি নিক্ষেপ করলেন্। পাশের পাহাড়শ্রেণীতে লাথি মারলো সে। পাথর ভেঙে সরস্বতী নদীর ওপর একটা সেতু তৈরি হয়ে গেলো।কেশবপ্রয়াগের দিকে পাঁচজনের দলটা চলছে। যুধিষ্ঠির পেছন দিকে তাকালেন, অনেকটা সময় নিয়ে তাকিয়ে রইলেন। একটা কুকুরও আছে তাদের সাথে। সেই বদ্রীনারায়ণ থেকে পিছু পিছু আসছে। বাদামী সাদার মিশ্রনে লোমশ একটা খোঁড়া কুকুর। কুকুরটা নিকট অতীতের কথা স্মরণে অক্ষম কিন্তু যুধিষ্ঠির জানেন, মহাপ্রভু তাকে সমস্তই জ্ঞাত করিয়েছেন। বাদামী এবং সাদা কুকুরটি, তাকে আমি রুধিরা নামে ডাকতে পারি কি?
হিমালয়ের যমদুয়ার ক্রমশ দৃশ্যমান হচ্ছে। রুধিরা এটা দেখতে পায়, আরও অনেককিছুই সে এখন দেখে যা সাধারণ মানুষেরা দেখতে পায় না। চুড়ান্ত পর্বের আগে নিয়তি অনেক কিছুই গুটিয়ে ফেলেছে। যুধিষ্ঠিরি এখন একা। অবশ্য রুধিরাকে যদি হিসেবে ফেলা হয় তাহলে এভাবে বলতে হবে, একজন জাতিস্মর স্বর্গারোহনের শেষধাপে অপেক্ষমান।




 আঁধারে আলো


রাত সাড়ে আটটার পর সুমনার সত্যিই চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়ালো। এত রাত তো অনিল কোনদিন করে না। তখনও মোবাইল ফোনের প্রচলন সাধারণ মানুষের মধ্যে শুরুই হয় নি, তাই কোন কারণে ফিরতে দেরি হলে, যেভাবেই হোক বাড়িতে একটা খবর দেওয়া অনিলের বরাবরের অভ্যাস। রাত যে খুব একটা হয়েছে তা নয়, কিন্তু আজ কোন খবর না দিয়ে এত রাত করায়, চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তিন বছরের বাচ্চাকে নিয়ে একা সে কিভাবে ও কোথায় খোঁজখবর করবে ভেবে পায় না। আরও কিছু সময় ভাবনা চিন্তাতেই কেটে গেল। এবার আশপাশের পরিচিত বাড়িতে গিয়ে সাহায্য চাওয়া ছাড়া আর উপায় রইলো না।
তার কাছে বিপদের কথা শুনে সকলেই একই কথা বললেন— “কান্নাকাটি করার কি আছে, এখন তো সবে দশটা বাজে, কোন কারণে আটকে গেছে। অফিসের কাজে হতে পারে, রাস্তাঘাটে জ্যাম হতে পারে, এত ভেঙ্গে পড়লে চলে? যাও বাড়ি যাও, চিন্তা করো না একটু পরে ঠিক চলে আসবে”।  সুমনা ছেলের হাত ধরে বাসায় ফিরে গেলে প্রতিবেশী নবীনবাবু,  অমলবাবুকে বললেন “যত্ত সব ন্যাকামি, দশটার মধ্যে স্বামী বাড়ি ফেরে নি বলে চোখের জলে বন্যা বইয়ে দিয়ে গেল। আমরা যেন আর চাকরি বাকরি করি নি। একবারে রোমিও জুলিয়েট মাইরি”। অমলবাবু শুধু বললেন, “এসব আজকালকার ছেলে মেয়েদের ন্যাকামো, বাইরের লোকের কাছে রোমিও-জুলিয়েট, ঘরের মধ্য সাপ-নেউল”।
ধীরে ধীরে একসময় ঘড়ির ছোট কাঁটাটা এগারোটার ঘরে গিয়ে পৌঁছলো। না, কোন সন্দেহ নেই, কিছু একটা বিপদ নিশ্চই হয়েছে। ঘুমন্ত ছেলেকে কোলে নিয়ে সুমনা একটু দুরে অনিমেষবাবুর বাড়ি গিয়ে সব বলে অনিলের অফিসের ফোন নম্বর দিয়ে একটু খোঁজ নিতে অনুরোধ করলো। অনিমেষবাবু যোগাযোগের অনেক চেষ্টা করলেন, কিন্তু অপর প্রান্ত থেকে কেউ ফোন তুললো না। অনিলের অফিসের কারো ব্যক্তিগত ফোন আছে কী না, সুমনার জানা নেই। থাকলেও সুমনার ফোন নম্বর তো দুরের কথা, পুরো নামটা পর্যন্ত কারো জানা নেই। অনিলের মুখে প্রদীপবাবু, অসিত, তন্ময়, মুরারীদা, ইত্যাদি কয়েকজনের নাম শুনেছে মাত্র। সুমনার কাছ থেকে ফোন নম্বর নিয়ে অনিমেষবাবু সুমনার ভাইকে ফোন করে সুমনাকে লাইনটা দিলে, সুমনা কাঁদতে কাঁদতে সব কথা বলে অফিসের ফোন নম্বরটা দিলো। কিছুক্ষণ পরে সেই ভাই আবার ফোন করে জানায় যে অনিলের অফিসের কেউ ফোন তুলছে না। রাতও অনেক হয়েছে কাজেই সুমনা যেন বাড়ি ফিরে যায়, কোন কারণে রাতে ফিরে না আসলে, কাল সকালে সে অনিলের অফিসের সাথে যোগাযোগ করে যা করার করবে। যোগাযোগের আর কোন উপায় না দেখে বাধ্য হয়ে সুমনা বাসায় ফিরে আসে।
সারা রাত জেগে কাটিয়ে ভোরবেলা অনিমেষবাবুর বাসার উদ্দেশ্যে আবার ছোটে সুমনা। পথে বাজারের ব্যাগ হাতে নবীনবাবুর দেখা। নবীন বাবু হাসিহাসি মুখে একটু ব্যঙ্গ করেই বললেন, “কি পতিদেবতাটি ফিরে এসেছে তো, তা কখন তিনি ফিরলেন”? এক ঝাঁক বিরক্তি নিয়ে সুমনা জানায় “না এখনও সে ফেরে নি”। মনে একটা আশা ছিল, রাতে  অনিল ফিরে না আসলেও ভাইটি যেকোন উপায়ে কোন একটা খবর জোগাড় করতে পারবেই। কিন্তু অনিমেষবাবুকে দেখেই সে বুঝতে পারে, যে এখনও কোন সন্ধান পাওয়া যায় নি। অনিমেষবাবু তাকে সান্তনা দিয়ে অফিস কাছারি খোলা পর্যন্ত অপেক্ষা করতে বলে স্ত্রীকে ডেকে বাচ্চাটা ও সুমনার জন্য কিছু খাবারের ব্যবস্থা করতে বললেন।
সকাল সাড়ে দশটা নাগাদ অনিলের অফিসে ফোন করে খোঁজ নিতে যাওয়ার ঠিক আগে তাঁর টেলিফোন যন্ত্রটি সশব্দে বেজে ওঠে। অনিমেষবাবু ফোনটা তুলে কিছুক্ষণ চুপ করে ও প্রান্তের কথা শুনে, দু-চারবার সংক্ষিপ্ত হ্যাঁ বা না বলে, থমথমে মুখে ফোনটি রেখে ভিতরে চলে গেলেন। অল্প কিছুক্ষণের মধ্যেই তিনি পোষাক পরে তৈরি হয়ে ফিরে এসে খুব ঠান্ডা গলায় সুমনাকে বললেন চলো। বিষ্মিত সুমনা অনিলের অফিসে ফোন না করে এখন কোথায় যাবে জিজ্ঞাসা করায়, অনিমেষবাবু একটু সময় নিয়ে বললেন, “তোমার ভাই ফোন করেছিলেন, গতকাল তোমার স্বামী অফিসেই যায় নি। আচ্ছা তোমার কী মনে হয়, ও অফিস না গিয়ে আর কোথায় যেতে পারে? আগে কখনও এরকম ঘটনা ঘটেছে? আমি তোমার বাবার বয়সী, সত্যি করে বলতো ওর স্বভাব চরিত্র কেমন ছিল”?
সুমনার চিৎকার করে কান্নায় ভেঙ্গে পড়ায়, এই প্রসঙ্গে আলোচনা বন্ধ করে তিনি একটা রিক্সা নিয়ে সুমনা ও বাচ্চাটিকে নিয়ে লোকাল থানায় গেলেন। থানার অফিসারটি সব শুনে বললেন আপনি একটা মিসিং ডাইরি করতে পারেন, তবে আমার মনে হয় তার আগে হাসপাতাল, মর্গ, বা ওনার আত্মীয় স্বজন বা বন্ধু বান্ধবের বাড়িতে একটু খোঁজ নিয়ে দেখা উচিৎ। মর্গের কথা শুনে সুমনার প্রায় অজ্ঞান হয়ে যাওয়ার মতো অবস্থা হ’ল। 
বৃদ্ধ অনিমেষবাবু থানা থেকে বেড়িয়ে সুমনাকে নিয়ে ট্যাক্সি করে একে একে অনিলের অফিস, বিভিন্ন হাসপাতাল, ও মর্গে ঘুরেও কোন সংবাদ না পেয়ে ফিরে আসার সময় চাঁদপাল ঘাটে লঞ্চে উঠে প্রথম খবরটা শুনলেন। সকাল থেকে তিনি খবরের কাগজ ওল্টাবার অবকাশ পান নি। গতকাল সকালে অফিস টাইম-এ রামকৃষ্ণপুর লঞ্চ ঘাটে চাঁদপাল যাওয়ার একটি লঞ্চ জেটিতে এসে দাঁড়াবার সময় একটু জোরে ধাক্কা লাগে। জেটি থেকে তখন অফিস যাত্রীরা লঞ্চে ওঠার জন্য হুড়োহুড়ি করছে। আচমকা ধাক্কার জেরে কয়েকজন লঞ্চ ও জেটির মাঝখানে পড়ে যায়। অনেকেই সাঁতরে পাড়ে উঠে আসে, কিন্তু ঠিক কতজন জলে পড়ে গেছিলো বোঝা যায় নি। দীর্ঘক্ষণ তল্লাসি করেও কাউকে না পাওয়া যাওয়ায়, আশা করা যায় এই ঘটনায় কেউ হতাহত হয় নি।
থানায় মিসিং ডায়েরি করার পর থেকে আজ দুই দিনে গঙ্গার বিভিন্ন ঘাটে চারটি ভেসে আসা মৃতদেহ সনাক্ত করার জন্য সুমনাকে ডেকে পাঠানো হলেও, একটা দেহও অনিলের নয়। কোন দেহই অনিলের না হওয়ায়, সুমনা মনে মনে খুশি হলেও সে বুঝতে পারে অনিলের ফিরে আসার সম্ভাবনা ক্রমশঃ ক্ষীণ হয়ে আসছে।
চতুর্থ দিনে অফিস থেকে অনিলের কিছু বন্ধু সুমনার সাথে দেখা করতে আসে। নানাভাবে সান্তনা দিয়ে তারা জানায় যে তাদের ধারণা, ঘটনার দিন অনিল হয়তো গঙ্গায় তলিয়ে গেছে। এতক্ষণে সুমনার কাছ থেকে জানা যায় যে অনিল সাঁতার জানতো না, আর তাই তার স্বামী রোজ হাওড়ার রামকৃষ্ণপুর লঞ্চ ঘাট থেকে চাঁদপাল ঘাটে লঞ্চে পারাপার করায় সে খুব ভয় পেত।
এবার অনিলের সহকর্মীরা জানায় যে তারা অনিলের অফিসের ওয়ার্কার্স অ্যাসোসিয়েশনের সদস্য। অনিলের যখন কোথাও কোন খোঁজ পাওয়া গেল না, তখন ধরে নেওয়া যেতে পারে যে সেদিনের লঞ্চ ঘাটের সেই দুর্ঘটনায় অনিল গঙ্গার জলে তলিয়ে গেছে। তারা ঐ লঞ্চ ঘাটে গিয়ে খোঁজ নিয়ে জেনেছে যে আকস্মিক জেটির সাথে লঞ্চের ধাক্কায়, সেদিন বেশ কয়েকজন জলে পড়ে যায়। অনেকেই সাঁতরে জেটিতে উঠে আসলেও সবাই উঠতে সক্ষম হয়েছিল কী না, জোর করে বলা আদৌ সম্ভব নয়, কারণ ঠিক কতজন জলে পড়ে গেছিল সঠিক জানা যায় নি। তাছাড়া লঞ্চ ও জেটির মাঝের অংশটিতে পড়ে গেলে পারে উঠে আসাও বেশ কষ্টকর, লঞ্চের ইঞ্জিন চালু থাকলে তো আরও কষ্টকর। এরপর অনিল ফিরে না এলে সুমনার কী কী অসুবিধা হতে পারে বুঝিয়ে বলে তারা অদ্ভুত একটা প্রস্তাব দেয়।
তারা জানায় যে কোন মানুষ হঠাৎ নিরুদ্দেশ হয়ে গেলে থানায় মিসিং ডায়েরি করার পর মৃতদেহ উদ্ধার করা গেলে, মৃতের ঘনিষ্ঠ লোকেদের দিয়ে শবদেহ শনাক্ত করা হয়। মৃতের ঘনিষ্ঠ লোকেরা শবদেহ শনাক্ত করলে নিয়ম মাফিক সেই ব্যক্তিকে মৃত ঘোষণা করা হয়, এবং পোস্টমর্টেম করে মৃতদেহ তার নিকট আত্মীয়দের হাতে সৎকার করার জন্য তুলে দেওয়া হয়। কিন্তু মৃতদেহ উদ্ধার করা না গেলে, সাত বছর তার ফিরে আসার জন্য অপেক্ষা করা হয়। সাত বছর অতিক্রান্ত না হলে তাকে মৃত বলে ঘোষণা করা যায় না, এটাই রীতি। এক্ষেত্রে অনিলের মৃতদেহ উদ্ধার করা না গেলে তাকে আইনত মৃত বলে ঘোষণা করা যাবে না। আর আগামী সাত বছর নিরুদ্দেশ অনিলের প্রভিডেন্ট ফান্ড, গ্র্যাচুয়িটি, ইত্যাদি কোন কিছুর টাকাই অফিস সুমনাকে ফেরৎ দিতে পারবে না, এমনকী অনিলের চাকরিটাও সুমনাকে দেওয়া অফিসের পক্ষে আইনত সম্ভব হবে না। সাত বছর পর অফিসের পক্ষে সুমনাকে মৃত অনিলের চাকরিটা দেওয়া সম্ভব হবে কী না, বা আদৌ দেবে কী না, আজ এখানে দাঁড়িয়ে সেটা জোর গলায় বলা খুবই শক্ত। এই সাতটা বছর সে তার শিশু সন্তানকে নিয়ে দারুণ অর্থাভাবে কিভাবে কাটাবে? তাই তারা মনে করে অনিলের দুর্ঘটনার কথাটা যখন অফিস ও পুলিশ জানেই, তখন এরপর গঙ্গায় কোন মৃতদেহ উদ্ধার হলে, সুমনা যেন তাকে তার মৃত স্বামী বলে শনাক্ত করে। এক্ষেত্রে স্ত্রী হিসাবে তার শনাক্তকরণই গ্রাহ্য হিসাবে বিবেচিত হবে। এরপর সুমনার পক্ষে অনিলের চাকরিটি বা তার প্রাপ্য সমস্ত টাকা পয়সা ফেরৎ পাওয়ায় আর কোন বাধা থাকবে না।
সমস্ত কথা চুপ করে শুনে সুমনা তাদের জানায়, যে সে তার ভাইয়ের সাথে কথা বলে কয়েক দিনের মধ্যে তার সিদ্ধান্ত জানাবে। এই ব্যাপারটা যত শীঘ্র সম্ভব সিদ্ধান্ত নেওয়ার পরামর্শ দিয়ে অনিলের সহকর্মীরা চলে যাওয়ার আগে শুধু বলে যায়, যে বেশি দেরি হলে ব্যাপারটা বিশ্বাসযোগ্যতা হারাতে পারে।
অনিলের সহকর্মীদের সমস্ত কথা ও বিপদের গভীরতার কথা চিন্তা করে সুমনা তার ভাইয়ের অমত থাকা সত্ত্বেও, তাদের পরামর্শটা মেনে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। ভাইয়ের সাথে পরামর্শ করার ঠিক পরের দিনই খবর আসে, যে নাজিরগঞ্জের কাছে গঙ্গায় একটি মৃতদেহ উদ্ধার হয়েছে। দুই ভাইবোনে মৃতদেহ ও তার পোষাক দেখে বুঝতে পারে, যে শবদেহটা আর যারই হোক অনিলের নয়। আরও অনেকেই সুমনাদের মতো শবদেহ দেখে শনাক্ত না করে ফিরে যায়। মৃতদেহটা তার স্বামীর বলে শনাক্ত করার আগে, সুমনা তার ভাইয়ের অনুরোধ ও পীড়াপীড়িতে চুপ করে থাকতে একপ্রকার বাধ্য হয়।
দিন তিনেক পরে সালকিয়ার কাছে গঙ্গায় একটি শবদেহ উদ্ধারের সংবাদ পেয়ে দুই ভাইবোনে আবার যায়। বেশ কয়েকটা দিন পার হয়ে যাওয়ায় সুমনা তার ভাইকে দৃঢ় কন্ঠে বলে, যে সুযোগ থাকলে আজ সে মৃতদেহটিকে অনিলের বলে শনাক্ত করবেই। ভাইও কোন উত্তর না দিয়ে চুপ করে থাকে, আগের সেই মনের জোর ও পাপবোধ বোধহয় এখন আর তারও নেই।
একে একে বেশ কয়েকজন মৃতদেহ দেখে শনাক্ত না করে ফিরে গেল। সুমনা ইচ্ছা করেই একটু সময় নিলো, অন্যের শবদেহ নিজের স্বামীর বলে দাবি করার মধ্যে একটা ঝুঁকি তো আছেই। জায়গাটা ফাঁকা হলে সুমনা তার ভাইকে নিয়ে মৃতদেহটা দেখেই ডুকরে কেঁদে উঠে আছড়ে পড়ে অজ্ঞান হয়ে গেল। মৃতদেহের দুটি চোখের জায়গাতেই বড় দুটো গর্ত, হয়তো মাছ তার চোখ দুটো খুবলে খেয়ে নিয়েছে। গোটা শরীর ও মুখ পচে, ফুলে, দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে। শুধু পরনের জামাকাপড় তাকে অনিল বলে চিনতে সাহায্য করছে।
হ্যাঁ, সহকর্মীরা তাদের কথা রেখেছিল। তাদের ঐকান্তিক ও আন্তরিক চেষ্টায় সুমনা অনিলের চাকরিটি পায়, অনিলের প্রাপ্য সমস্ত টাকা অফিস থেকে ফেরৎ পায়। ছোট্ট ছেলেটাকে ভালো স্কুলে ভর্তি করে।






অমল ধবল পালে


অমলাদি নামজাদা গায়িকা । বেতারে নিয়মিত গান করে । টিভিতেও মাঝেমাঝে দেখা যায় তাকে । ব্যবহারে সে অমায়িক । অমলাদির স্বামী আর ছেলে কোলকাতা শহরের নামী ডাক্তার ।
পাড়ার ছেলে বিলোল অমলাদির অন্ধ ভক্ত । শুধু তার গানের জন্য নয় । সুন্দর আচরণের জন্যও । বিলোলের কিছু জিজ্ঞাসা ছিল তার কাছে ।
সেদিন স্টেশনে একান্তে দেখা হতেই এক-মুখ হেসে তার কাছে কিছু কথা জিজ্ঞেস করলো ও । 
প্রথমেই বলল তাকে,''আপনি গানের জগতের মানুষ হয়ে ছেলেটাকে ডাক্তার করলেন ?''
শুনে হাসল অমলাদি ।
হেসে উত্তর দিলো,''যার যেদিকে ন্যাক । সে আমি কী করে বলবো ? আমি কি কখনো ডাক্তার হতে চেয়েছিলাম ?''
''
বেশ'' বলে হেসে বিলোল এবার তাকে অন্য প্রশ্ন করলো ।
''আচ্ছা,দিদি । আপনি তো গানের মানুষ । তা ডাক্তার-পাত্র পছন্দ করলেন কেন ? ডাক্তার গানের কি আর বোঝে ।'' 
শুনে বেশ মজা পেলো অমলাদি ।
তারপর বলল,''আমি কী আর পাত্র পছন্দ করেছি ? আর তখন কি অত ভেবেছি ডাক্তার গান বোঝে বা বোঝে না ? তাছাড়া..''
''
তাছাড়া কী,দিদি ?''
খুব আগ্রহের সঙ্গে বিলোল জানতে চাইলো তখন ।
অমলদাদি মুচকি হাসল ।
পরে উত্তর দিলো,''তাছাড়া ডাক্তার বলে কথা । বাবা-মা তার টাকার কথাও নিশ্চয় ভেবেছিলোআমিও ভেবেছিলাম বৈকি ।''
অমলাদির সরল উত্তর পেয়ে বিলোল বেশ খুশী হল ।
মাথা নেড়ে বলল ও,''এটাই তো স্বাভাবিক ।''
তার কিছু পরে বিলোল অমলাদিকে প্রশ্ন করে বসলো,''আরও প্রশ্ন আছে । তবে আর একটা প্রশ্ন করি । কেমন ?''
অমলাদি হেসে উঠে বলল,''বেশ তো । বল দেখি ।''
বিলোল তখন স্মিত হেসে চারদিক তাকিয়ে বলে বসলো,''আপনার গান দাদা আর ছেলে শোনে ? আপনাকে তোয়াজ করে ?''
বিলোলের কথা শুনে হেসে মরে তখন অমলাদি । দেখে অবাক বিলোল । তার দিকে হাঁ করে তাকিয়ে থাকে ।
তারপর অমলাদি তার নিখুঁত তাল-লয়ের মতো নিখুঁতভাবে হাসি সামলে উত্তর দিলো,''আমার প্রতিটা সুর ওদের প্রতিটা টাকায় ঢেকে যায় । এ আমি বিলক্ষণ বুঝতে পারি । কি যে এক প্রশ্ন করলে আমাকে । মনে হচ্ছে এখব আমার ডাক্তার হওয়াই বেশ ছিল । টাকাই এখন জীবনের সুর । বোঝো না তুমি ?'' 
বিলোল শুনে খুব লজ্জা পেলো ।
আমতা আমতা করে অস্ফুট-গলায় বলল তখন,''অমন প্রশ্ন আমার না করাই উচিৎ ছিল,দিদি । ভেরি সরি ।''
তারপর স্টেশনে ট্রেন এলো । কখন যে অমলাদি পাশ থেকে উঠে ট্রেন ধরার জন্য বিদায় নিয়েছে,বিলোল তা বুঝে উঠতে পারেনি । ট্রেনটা স্টেশন ছেড়ে বেরিয়ে যেতেই বিলোলের কানে এলো অমলাদির মধুঝয়া কণ্ঠের সেই গান--
'
একা মোর গানের তরী
ভাসিয়েছিলাম নয়ন জলে ।'
বিলোলের দু'চোখের পাতা ভারি হয়ে গেলো তারপরেই ।



বাসাংসি জীর্ণাণি

 হ্যালো সঞ্জয় বক্সী বলছেন।”“বলছিআমরা নিউ হরাইজেন থেকে বলছি। আমরা আবার আপনার বাবা কে অর্থাৎ অনন্ত বক্সী কে বাঁচাতে পেরেছি।মানে উনি রিভাইভ করেছেন। কি বলবে সঞ্জয় বুঝতে পারছে না।থতমত খেয়ে বলল, “তাই?”ওপাড় থেকে আরও উচ্ছসিত স্বর বলে চলেছে, “ আবিষ্কার গোটা পৃথিবীর চিকিৎসা ক্ষেত্র কে তোলপাড় করে তুলবে।আপনার বাবার সব কিছু মনে আছে।যদিও উনার শরীর টি ৪৫ বছরের একটি মানুষের। কিন্তু কথা বললেই বুঝবেন উনি আসলে আপনাদের প্রিয় সেই মানুষ টি। উনি উদগ্রীব হয়ে আছেন আপনাদের সাথে দ্যাখা করবার জন্যে।আমরা আপনাকে ফোন করে এবার প্রেসমিট করব।বেলা ১২ টা নাগাদ কনভয় উনাকে নিয়ে আপনাদের বাড়ি পৌঁছে জাবে।বেস্ট অফ লাক্‌।"আচ্ছা ঠিক আছেএছাড়া আর কিছু মুখ থেকে বার হোল না সঞ্জয় এর।

বাইকের ধাক্কা তে ৬৫ বছরের বাবা মারা যান। হাসপাতালে অল্প বয়স্ক একজন ডাক্তার এসে বলেছিল।উনার দেহ টা দেবেন। আমাদের একটা প্রজেক্ট আছে।বাবা অসাধারন কিছু নন। পোড় খাওয়া গেরস্ত।এক তলা বাড়ি , পেন্সন,শরিকি ঝামেলা, হোমিওপ্যাথি ওষুধ ,পটলার চায়ের দোকানে তিন কাপ চাএটাই বাবা। তাঁর মাথাটা অন্য দেহে প্রতিস্থাপিত করা হবে। বিজ্ঞান পড়া কেরানী সঞ্জয় বক্সী রাজী হয়েছিলেন।আর তারপর ভুলেও গিয়েছিলেন। তিন বছরের ওপর হলও।আসলে অবিশ্বাস্য ব্যাপার টা নিয়ে ভাবেননি বেশী।

মোবাইল নামিয়ে বাড়ির সব্বাই কে ব্যাপার টা বলল সঞ্জয়। সব্বাই মানে ছেলে আনন্দ, বউ রিনি, আর মা সুতপা। আনন্দ লাফ দিয়ে টিভি খুললঠিক লাইভ কভারেজ দেবেরিনি আজকাল হাতকাটা নাইটি পড়ে।একটু থমকে গেল সে।সুতপা প্রথম দফায় কিছুই বুঝতে পারলেন না।কিছুটা হতবুদ্ধি হয়ে নিজের ঘরে চলে গেলেন।তাঁর সামনে ক্ষয়াটে আয়না।নিজের বৃদ্ধ শরীর।তাকিয়ে থাকলেন অনেকক্ষণ।যে ফিরছে আর বয়স যে ৪৫টিভি টে সম্প্রচার হচ্ছে।এরপর গবেষকদের মস্তিষ্ক এই ভাবে বাঁচিয়ে রাখা যাবে বিজ্ঞাপনের ফাঁকে ফাঁকে বক্তব্য চলছে।সঞ্জয় বাবার চেয়ারে বসলেন , “আচ্ছা বাবা আবার পেনশন পাবেন তো”? 


বাবুইবাসা
                          
          

---হুটহাট আবদার করলে হয় ! টুটুকে কার কাছে রেখে নীচে নামি বলত ? এমনিতেই ছিকেই ঝুলছি সারাক্ষণ ; তারওপর ভোর থেকে লিফট ঘাওড়ামি শুরু করেছে ! চোদ্দতলা ঠ্যেঙ্গিয়ে দিনে পাঁচ ওক্ত তোমার সাথে মিট করা সম্ভব না !ফোনের ওপার থেকে পুরুষকণ্ঠ মনে হল যেন নিরুৎসাহিত হতে হতে ক্রমশ জালাধানের বাইরে বেরিয়ে গেল ।
সন্ধ্যা ছয়টার কাছাকাছি দারুণ একটা চেনা ছন্দে অস্থির হয়ে ছুটোছুটি শুরু করে দেয় টুটু ! সপ্তাহের বিশেষ একটা দিন , বিশেষ একটি অদৃশ্য উড়ানের ডানা যেন তাঁর সর্বাঙ্গে স্নেহচুম্বনের ছায়ার মত তাকে তোলপাড় করে তোলে ! টুটু হাত বাড়িয়ে তার মাকে ছুঁতে চায় ! ---- মা যেন তার কাছে দূরগ্রহের ডানাওয়ালা বন্দিনী দেবদত্তা !
সকাল-সন্ধ্যা  ইয়ার উড়ানের শব্দে ঝুলবারান্দার কাছে ছুটে ছুটে আসে টুটু । ওকে আটকানো, আর গ্রিলে বসা পাখিদের  তাড়ানো , তাদের উড়িয়ে দেওয়া, এই তোকে উড়িয়ে দিলাম যা !--- ই হল সরস্বতীর সারাবেলার কাজ ! সরস্বতী এ শহরের সবচেয়ে উঁচু ফ্লাটের আনাড়ি আয়া ! ওর মনের গতি প্রকৃতি এমন , যেন গ্রাম থেকে তুলে আনা একখামচা ত্যাঁদড় এঁটেল মাটির দলা ! শত সাবান শ্যাম্পুতেও তনু ওর ভেতরের আঠালো ভাবখানা কাটাতে পারে না কিছুতেই ; এমনই একরোখা মনোভাব ও! সবসময় শূন্যে ঝুলতে ঝুলতে ওরও  কেমন যেন মাথাটা চক্কর দিয়ে ওঠে ; তাই তো ওর মন পড়ে থাকে গেটম্যান রীতেশের কাছে ! দিনে দুএকবার ফিডিং বোতল ,  খেলনা গাড়ি, টয় ট্রেন টুটু ছুঁড়ে ফেলে দিলে সরস্বতী খুশিই হয় ! তখন সরস্বতী হাসিমুখে গড়গড়িয়ে সিঁড়ি ভাঙে । ওর কাছে লিফট তো আসলে বাবুদের সাথে বিলিতি বিলাসিতায় পাংগা নেবার সামান্য একটা যন্ত্র মাত্র !
উইকএণ্ডে তনু ঘরে ফেরে । অরিন্দমের ওন ওয়ার্ল্ড হাফইয়ারলি । অনুঢা সরস্বতী ওদের দাম্পত্য জীবনের মাইক্রোওভেন সম্পর্ক দ্যাখে আর শুনিয়ে শুনিয়ে তার দেশ গাঁয়ের গল্প করে । একনিষ্ঠ শ্রোতা বলতে বছর দেড়েকের টুটু ,----আমাদের মা কাকিরা দাওয়ার মেঝেয় গড়ে গড়ে বিছেন কাঁথা ফ্যালে ; আর বাপ খুড়োরা ছিলুম টেনে চোখ লাল করে কাছে এসে আদর করে ডাকে,--কোই শোনছো ---! দূর ! দূর !  আদর নেই সোহাগ নেই ; দুদণ্ড একত্র বসে দুটো সুখ দুঃখের কথা নেই ! বোম্বেটো শহরে কী বিচ্ছিরি রকমের উড়াউড়ি সংসার ! আমি আগে জানলে রীতেশের কথায় দেশ ভুঁইয়ের মাটি থেকে কক্ষনও পা কাড়াতুম নাকি !তনু ইণ্ডিয়া এয়ারলাইন্সের এয়ার হোস্টেস , আর অরিন্দম সিঙ্গাপুর এয়ার লাইনসের পাইলট । পাখিরা খড়কুটোর খোঁজে মাটিতে ড্রপ করে , আর ওরা তার ঠিক বিপরীত । ওরা আসে খড়কুটো রাখতে । সংগ্রামী জীবনের সঞ্চয় রাখতে ।  হাওয়াই মুলুকের এতবড় ফ্লাটখানিতে ছোট্ট টুটু সরস্বতী ছাড়া , সবই যেন নিষ্প্রাণ জঞ্জাল --- জড়ভারে ভারাক্রান্ত আসবাব আর প্রসাধন !
---তুই টুটুকে একা রেখে এতবার ল্যাণ্ড করিস ক্যান সরস্বতী ?
---
কে বলেছে ওই লিফটম্যান ছোটেলাল  ?
---
তুই কি জানিস , তোর পেছনে কতগুলো চোখ লাগান আছে !
---
তবে ওই সিসিফুটেজের কাছেই জিজ্ঞেস কর না কেন ! ওর থেকেই তো আপডেট নিতে পার বৌদিমনি ! টুটুর খেলনাগুলো এখনও অব্দি মাটিতেই পড়ছে যে ! যেদিন থেকে ও গুলি উপরের---!
---
জাস্ট শাট আ! তুই তো মারাত্মক উদ্ধত মেয়ে রে !  সরস্বতী তুই কি জানিস না , ও এখন হাঁটতে শিখছে ! একপা দুপা করে ব্যালকনির কাছে সরে এলে কতবড় সব্বনাশ হবে তুই একবার ভেবে দেখেছিস ? 
---কি জানি বাপু ! গাঁয়ের তালগাছের টোক্কায় উল্টানো বাসা দেখে দেখে এই পন্ত বয়েস আমার ; কোনদিন তো দেখিনি ওখান থেকে একটা পাখির ছাঢুপ করে মাটিতে পড়েছে কোনকালে ! বরং দেখেছি , মা পাখি অনুমতি দেওয়ার আগেই , ছানাগুলো দিব্বি ক্যামন ফুরফুর করে ইদিক সিদিক উড়ে পালায় ! 
গেল মাসে একটা লক সিস্টেম চেইন কিনে এনেছে তনু । পৃথিবীর সব মায়েরা ইচ্ছা করলেই যে যশোদা হতে পারে না , এটা এখন মর্মে মর্মে অনুভব করতে পারে তনু ! তবু , তালগাছ দ্যাখা সরস্বতীকে দিয়ে বিশ্বাস নেই ! আজকাল ফ্লাইট থাকলেই অস্থির হয়ে ওঠে তনুর চোখদুটো ; সরস্বতী যেন রোজই শূন্যে  উড়িয়ে দিচ্ছে তার ছোট্ট  টুটুকে !
ইদানীং দিল্লিতে দারুণ কুয়াশা ! ল্যাণ্ডিং , টেক অফেও  দারুণ বিভ্রাট দ্যাখা দিচ্ছে ! স্যাটেলাইট রিপোর্টে  বারবার উঠে আসছে শহরের ভ্রাম্যমান এক বিশেষ প্রজাতির দুঃসাহসী পাখির কথা ,---যারা উড়ানের শব্দ শোনামাত্র অস্থির হয়ে ওঠে ! আর সেই শব্দ অনুসরণ করে রকেট গতিতে ছুটে চলে উইংএর আগে আগে ! যতক্ষণ পর্যন্ত ওদের ডানা প্রপেলারে না জড়াচ্ছে ততক্ষণ পর্যন্ত কিছুতেই পথ ছাড়বে না ; এমন বেপরোয়া ওরা ! এখন শূন্যে ভাসলেই তনুর ভেতরটা মাঝে মাঝে দোমড়ানো অভ্রের মত দলা হয়ে আসে ! তনুর মনে হয় , এসব ইনোসেন্ট পাখিগুলো নিশ্চই ওই উদ্ধত সরস্বতীর হাতগলে প্রপেলারের  সামানে উড়ে আসছে !


About