মান্ডলার হান্টেড কাহিনী--

ওরা কারা !
(অলৌকিক, সত্য ঘটনা আধারিত)
                               

ভিলাই থেকে জবলপুরের দিকে ট্যাক্সি ছুটে চলেছে। ট্যাক্সিতে আমার মেয়ে, জামাই, ছেলে আর দুই নাতনী। তখন রাত প্রায় বারটার কাছাকাছি। ড্রাইভার পথ ভুলে শর্টকাট ছেড়ে লম্বা রাস্তা ধরে ছিল। ওরা তখন নয়ন পুরের কাছাকাছি, নয়নপুর মান্ডলা  জেলার এক তহসীল শহর। মানে, জবলপুর তখনও আড়াই শ কিলোমিটার দূরে। ওদের ট্যাক্সির পেছনে পেছনে নেভিব্লু রঙের একটা মিনি ট্রাক বেশ কিছু সময় ধরে পিছু পিছু আসছিল।   

হঠাৎ এক জাগায় ওদের রাস্তা ব্লক দেখা গেল ! সামনে রাস্তা জুড়ে উঁচু ঢাই মারা বালির স্তূপ। পেছনের গাড়িটাও দাঁড়িয়ে গেল। দেখা গেল, রাস্তার পাশে ডান দিক কেটে একটা কাঁচা অপেক্ষাকৃত সরু রাস্তা চলে গেছে। অগত্যা ট্যাক্সি ঘুরিয়ে ড্রাইভার সেই কাঁচা রাস্তায় এসে নাবল।  
কাঁচা পথ ধরে গাড়ি চলেছে। এত সময় ট্যাক্সির সবাই হালকা ঘুম দিয়ে নিয়ে ছিল। এখন সবাই সজাগ। গাড়ি ধীরে ধীরে চলেছে। পেছনে নীলাভ গাড়িটাও আসছিল। কিন্তু এ কি ! এক গ্রামের কাছে এসে রাস্তা যে শেষ হয়ে গেল! ওদের সামনে ঘুমন্ত এক গ্রাম--একেবারে নিঝুম পড়ে আছে। গ্রামের এক পাশ ধরে কয়েকটি কবর চোখে পড়ল—সাদা বর্গাকৃতি স্মৃতিসৌধ। আবছা চাঁদের আলোয় সব কিছু দেখা যাচ্ছিল। চারদিক নিঃশব্দ—জনপ্রাণীর টু সাড়াটুকু নেই ! মনে হল কোন প্রাক ঐতিহাসিক কালের কোন মৃত গ্রাম ওদের সামনে দৃশ্যমান হয়ে আছে।

ঠিক এমনি সময় হঠাৎই যেন আকাশ মেঘাচ্ছন্ন হয়ে এলো। শন শন হওয়া, ঝড় শুরু হয়ে গেল। ড্রাইভার তাড়াতাড়ি গাড়ি ঘুরিয়ে নিলো। এদিকে বিদ্যুৎ চমকাতে লাগলো সে সাথে বাজ পড়ার শব্দ হল । এবার কি হবে ? সবার মনে সে প্রশ্নই নাড়া দিয়ে যাচ্ছিল। দূর থেকে দেখা গেল সেই কাঁচা রাস্তার ডান দিকে একটা ট্রাক ধীরে ধীরে নেমে যাচ্ছে। তার মানে ও দিকে আরও একটা রাস্তা আছে হবে। সেই রাস্তার কাছাকাছি এসে ট্যাক্সি দাঁড় করালো ড্রাইভার। হয় তো দেখে নিতে চাইল বাস্তবেই কোন রাস্তা আছে কি না। পেছনে নীল রঙের গাড়িটাও এসে দাঁড়িয়েছে। নীল রঙের গাড়িটা আসলে ছিল মিউনিসিপাল কর্পোরেশনের ভেন। 

ঝড় ঝাপটার মধ্যে বৃষ্টি হয়ে চলেছে, মাঝে মধ্যে গুড়ুম গুড়ুম শব্দে এক আধবার বজ্র পাতের আওয়াজ হচ্ছে। ঠিক এমনি সময় গুড় গুড় গুড় ভারী একটা আওয়াজ পেছন দিকের সেই মৃত গ্রামের দিক থেকে আসছিল। কিসের শব্দ শুরুতে কিছুই বোঝা যাচ্ছিল না। ট্যাক্সি একটু সময় আগে ট্রাক নেমে যাওয়া রাস্তায় মোড় নিতে গিয়েও থেমে গেল। তখন পেছনের গুড় গুড় শব্দে বোঝা যাচ্ছিল কোন গাড়ি আসছে বলে। সেই আগত, অজ্ঞাত গাড়িটিকে পাস করে যাবার সময় দিয়ে থাকবে ড্রাইভার। খড়র খড়র খটারা গাড়ির শব্দ করে একটা এম্বাসেডর গাড়ি এসে থামল ট্যাক্সির ডান দিকের পাশটাতে। জামাই তখন তন্দ্রাতে ছিল,নাতনী দুজন তখন ঘুমিয়ে। মেয়ে, আমার ছেলে, আর ড্রাইভার এক সাথে ভয়ে আঁতকে উঠল পাশে এসে দাঁড়ান এম্বাসেডরের দিকে তাকিয়ে। গাড়িটার এ কি অবস্থা--সমস্ত গাড়িটা ভেঙ্গে চুরে দুমড়ে আছে !

গাড়ির ওপরে ছাদ নেই আর ওরা করা বসে আছে তার মধ্যে ? সবার শরীর সাদা ব্যান্ডেজে ঢাকা--পা থেকে মাথা পর্যন্ত সাদা প্লাস্টারে মোড়া। সবার তখন পিলে চমকানো অবস্থা। ডাকাত ! এবার কি তবে ডাকাতের পাল্লায় পরেছে ওরা ? তা না হলে এমন পোশাক কেন ? পাঁচ পাঁচটা লোক বসে আছে এম্বাসেডরে, তাদের প্রত্যেকের চেহারা লম্বা-চওড়া, চোখ দুটো ছাড়া বাকি দেহ ব্যান্ডেজে একেবারে প্যাক করা!

ভয়ে ট্যাক্সির দর্শকরা বোবা হয়ে গেছে--স্বপ্ন আর বাস্তবতার এক মাখামাখি অবস্থা। শারীরিক অনুভূতি সবার মধ্যে যেন অনেক কমে গেছে। একদম সামনে ডান দিকের সিটে বসে ছিল আমার মেয়ে। ভয়ে তার মুখের কথা ফুরিয়ে গেছে, আমার ছেলে ড্রাইভারের বাম পাশে বসে, সে অজানা কোন আশঙ্কায় মুহূর্ত গুনে চলছিল--এই বুঝি কোন অঘটন ঘটে যাবে--এমনি অবস্থা। এ দিকে ঝড়জল, বিদ্যুৎ চমক, বজ্রপাত সব কিছু হয়ে চলেছে। জামাই পেছনের দিকে বামদিকের সিটে বসে--তাঁর ঘুমের ঝিম ঝিম ভাব ছিল—এ দৃশ্য-চমকের বাইরেই ছিল সে। নাতনীরা ঘুমে তখন অচেতন। ড্রাইভার নির্বাক, সেও ভয়ের দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে তোবড়ান গাড়ি আর প্ল্যাসটার জড়ান তার পাঁচ আরোহীর দিকে। এমনি অবস্থায় একবার সেই অলৌকিক গাড়ির ড্রাইভার ওদের ট্যাক্সির দিকে মুখ ফেরালো। তার শুধু মাত্র দু চোখের অংশটুকু খোলা। এমনিতে চোখ দেখা যাচ্ছিল না, তাকাবার পরে মনে হল দুটো ঘোলাটে চোখ জ্বলে উঠে আমার নিভে গেল। আর কয়েক মুহূর্ত পর হুস শব্দ করে চোখের সামনে দিয়ে সে গাড়ি সামনের দিকে অদৃশ্য হয়ে গেল!

কিছু সময় সবাই স্তম্ভিত হয়ে ছিল। সম্বিত ফিরতে ট্যাক্সির ড্রাইভার গাড়ি স্টার্ট দিয়ে ডানদিকে মুড়ে আগের চলে যাওয়া ট্রাকের পথ অনুসরণ করল। গাড়িতে বেশ স্পিড--এবড়ো খেবড়ো কাদা মাটির মেঠো রাস্তা ঘুরে শেষে আবার পাকা রাস্তায় গিয়ে উঠেছে। ভয়ে ভয়ে সবার চোখ বারবার ফিরে তাকাচ্ছে পেছনের দিকে, সেই তোবড়ানো এম্বাস্যাডার ওদের পিছু তো করছে না! না কাউকে দেখা গেল না, কেবল সেই নীল গাড়িটা তখনও পিছে পিছে আসছে। আর আশ্চর্য, আকাশে তখন একটুও মেঘ নেই, একটু আগে ঝড়, বৃষ্টি, বজ্রপাত হয়ে গেছে কে বলবে ! পাকা রাস্তায় এসে কিছুটা ভয়ের জড়তা কাটিয়ে নেবার চেষ্টা করে মেয়ে আমার ছেলেকে ডেকে ভীত চাপা স্বরে বলেছিল, ভাই, দেখলি ? 
ভাই তখন ভয় পেয়েছে খুব, সে চাপা গলায় বলল, এখন কথা না--ড্রাইভারকে বলল, গাড়ি তেজ ভাগও ! 
জামাই তখনও বোধহয় ঘুমের মধ্যেই ছিল। ট্যাক্সি তখন খালি রাস্তা পেয়ে শ কিলোমিটার স্পীডে ছুটে চলেছে। পেছনের নীল গাড়ি তার চেয়েও বেশী স্পীডে ট্যাক্সিকে পাস করে আগে আগে ছুটছে। ব্যাস, এই পর্যন্ত ঘটনা।  

এখন প্রশ্ন হল--ওরা কারা ? সমস্ত শরীর ওদের প্লাস্টারে মোড়া কেন ছিল ? ওরা কি ডাকাত ছিল ? আতঙ্কবাদী ছিল ? ডাকু বা আতঙ্কবাদী হলে অমন ভাবে প্লাস্টারে সারা শরীর মুরে থাকবে কেন ? বেশী হলে চিনে নেবার ভয়ে মুখ ঢেকে আসবে। আর এম্বাস্যাডার তো ও রকম ভাংচুরের পর সচল থাকার কোন কথাই নয়! ভেঙে দুমড়ে মুচড়ে একাকার--জড়ো বস্তুর মতই দেখাচ্ছিল ওটাকে। চলছিল, তাই গাড়ির আকৃতি ভেবে নিতে পেরেছিল সবাই। তাও আবার সে গাড়ির মাথার দিক নেই সব কটা লোককে সশরীরে দেখা যাচ্ছিল! তবে কি কখনও কোন দিন এখানে ভয়ঙ্কর কোন এক্সিডেন্ট ঘটে ছিল—যাতে কিনা ওই ড্রাইভার সহ ওই পাঁচজনই মারা গিয়েছিল! কি এর আসল রহস্য তা এখনও পর্যন্ত মনের মাঝে প্রশ্ন হয়েই থেকে গেছে--ওরা করা!
                                                          

    
    


0 comments:

Post a Comment

About